ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারি রাশিয়ার

ইউক্রেনকে দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গোপন প্রযুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর ব্রিটেনকে সরাসরি সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিল মস্কো।
ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে ব্রিটেন ও রাশিয়ার সংঘাত এবার আরও বিপজ্জনক মোড়ে। ইউক্রেনকে দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গোপন প্রযুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর ব্রিটেনকে সরাসরি সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিল মস্কো। রাশিয়ার বক্তব্য, ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবহার করে রুশ ভূখণ্ডে হামলা হলে পাল্টা জবাবে ইউক্রেনের ভেতরে তো বটেই, তার বাইরেও ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে এই হুঁশিয়ারি দেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেনকে স্পর্শকাতর ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স কার্যত ‘আগুন নিয়ে খেলছে’। পরিস্থিতি না বদলালে এর পরিণতি ‘সম্পূর্ণ অনিশ্চিত’ এবং ভয়াবহ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
জাখারোভার দাবি, ব্রিটিশ অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার মস্কোর রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে রাশিয়া আগেও সতর্ক করেছে। লন্ডন এখন রুশ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে মস্কো যাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলছে, তার আইনি সহযোগী হয়ে ওঠা থেকে মাত্র ‘এক ধাপ দূরে’ বলেও দাবি করেন তিনি।
যে সিদ্ধান্তে এত ক্ষুব্ধ মস্কো
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যৌথভাবে তৈরি দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো/স্ক্যাল্প ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। গত ২৪ আগস্ট, ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে কিয়েভ সফরে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ঘোষণা করেছেন, স্ক্যাল্প ক্ষেপণাস্ত্রের ব্রিটিশ-নির্মিত যন্ত্রাংশের গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য ইউক্রেনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এতে ফ্রান্সের সহযোগিতায় ভবিষ্যতে ইউক্রেনেই ক্ষেপণাস্ত্রটির সংযোজন ও উৎপাদনের পথ তৈরি হবে।
স্টর্ম শ্যাডো মূলত বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এই অস্ত্র শক্তিশালী বাংকার ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। ইউক্রেন ইতিমধ্যেই রুশ লক্ষ্যবস্তুতে এ অস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ব্রিটিশ প্রযুক্তি হাতে পেলে কিয়েভকে শুধু বিদেশ থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে না, ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎপাদন ও মজুত গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হতে কয়েক বছরও লাগতে পারে।
ডনেৎস্কের হামলার পর আরও কড়া হুমকি
মস্কোর নতুন হুঁশিয়ারির ঠিক এক দিন আগে রাশিয়া অভিযোগ করে, রুশ নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউক্রেনের ডনেৎস্ক শহরের একটি বিপণিবিতানে স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার দাবি, ওই হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এর পরই জাখারোভা বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্রের সংযোজন ইউক্রেনে সরিয়ে দিয়ে লন্ডন বা প্যারিস দায় এড়াতে পারবে না। রুশ ভূখণ্ডে হামলার জন্য ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ‘সরাসরি দায়’ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আগেই ব্রিটিশ কারখানার দিকে আঙুল
হুমকির শুরু অবশ্য বৃহস্পতিবার নয়। ২৫ আগস্ট ক্রেমলিনের উপদেষ্টা এবং রাশিয়ার সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই ফেদোরভ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য ড্রোন তৈরি করা ব্রিটিশ কারখানাগুলিতে ভবিষ্যতে ‘অজানা উৎস’ থেকে হামলার আশঙ্কা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারেন না।
ফেদোরভ সম্ভাব্য সাইবার হামলা বা কোনও ধরনের ‘আধা-সামরিক’ প্রতিক্রিয়ার কথাও বলেছিলেন। তবে সেটিকে তিনি সরাসরি রুশ সরকারের আনুষ্ঠানিক হামলার ঘোষণা হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও ২৪ আগস্ট ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, লন্ডন যুদ্ধের আগুনে নিয়মিত ‘জ্বালানি ঢালছে’ এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির পথে বাধা তৈরি করছে। রাশিয়া ইউক্রেনের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।
পাল্টা বার্নহ্যাম, ‘আগুনটা শুরু করেছিল কে?’
মস্কোর অভিযোগে পিছিয়ে আসার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি লন্ডন। কিয়েভ সফরে রাশিয়ার বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর হুমকি’ বলে উড়িয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম। রাশিয়া ব্রিটেনকে যুদ্ধের আগুনে জ্বালানি ঢালার অভিযোগ করলে তাঁর পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ‘আগুনটা শুরু করেছিল কে?’ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের দিকেই ইঙ্গিত করেন তিনি।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থনের অবস্থান থেকে লন্ডন সরছে না।
এদিকে উত্তেজনার মধ্যেই আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সামনে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ চলতি সপ্তাহে মস্কো সফর করেছেন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনও সদস্য রাষ্ট্রে হামলা না চালাতে রাশিয়াকে সতর্ক করেছেন তিনি। যদিও রাশিয়া ন্যাটোয় হামলার পরিকল্পনা করছে এমন খবরকে ক্রেমলিন ‘ভয় ছড়ানোর গল্প’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফলে স্টর্ম শ্যাডোর নকশা হস্তান্তরের বিতর্ক এখন আর শুধু ইউক্রেনের অস্ত্র উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এক দিকে ন্যাটোর অন্যতম প্রধান শক্তি ব্রিটেন, অন্য দিকে পরমাণু শক্তিধর রাশিয়া–দুই পক্ষের হুমকি-পাল্টা হুমকি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে মস্কো প্রকাশ্যেই ইউক্রেনের বাইরের ব্রিটিশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর কথা বলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সীমানা ছাড়িয়ে সংঘাত ছড়ানোর আশঙ্কাটাই তাই নতুন করে সামনে চলে এসেছে।







