গুলি নয়, গুজবেই ব্রিটেনকে ‘ঘায়েলের ছক’ রাশিয়ার

সংগৃহীত ছবি
বন্দুকের গর্জন নেই। সীমান্তে ট্যাংকও নামেনি। তবু ব্রিটেনকে ঘিরে চলছে অন্য এক যুদ্ধ। অস্ত্র তার বানানো খবর। লক্ষ্য মানুষের বিশ্বাস। কখনো বলা হচ্ছে, দেশটি অচল। কখনো প্রতিরক্ষাহীন। কখনো আবার রাশিয়ায় ব্রিটিশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গল্প ছড়ানো হচ্ছে। ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানো ব্রিটেনকে ঘিরে রুশ রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ প্রচারমাধ্যমের এমন তৎপরতা নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইনডিপেনডেন্টের বিশেষ অনুসন্ধানে আজ সোমবার বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে রাশিয়ার রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন হিসাব থেকে ব্রিটেন নিয়ে কয়েক লাখ প্রচারবার্তা ছড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওসাভুলের হিসাবে, শুধু সেপ্টেম্বরেই প্রকাশিত হয় ৪০ হাজার ৩৬৫টি বার্তা। আগস্টের তুলনায় বৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। অক্টোবরেও ছিল প্রায় একই তৎপরতা।
প্রচারের কৌশল কখনো সম্পূর্ণ মিথ্যা, কখনো সত্য ঘটনাকে বিকৃত করা। যেমন দাবি করা হয়েছে, ব্রিটেন রাশিয়ার ভোরোনেঝ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। লন্ডনের পাতালরেল থেকে রাশিয়ায় হামলা চালিয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। অথচ পাতালরেলের পরিত্যক্ত একটি স্থানে হয়েছিল সামরিক প্রস্তুতির মহড়া। বাস্তব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নয়।
আরেকটি প্রচারে দাবি করা হয়, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারে গ্রেপ্তারের হুমকি দিচ্ছে ব্রিটিশ পুলিশ। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দেশটির পতন ঠেকাতে অক্ষম বলেও ছড়ানো হয় বার্তা।
কিয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার পরও একই কৌশল দেখা গেছে। তাকে ঘিরে ১৭২টি সন্দেহজনক হিসাব থেকে এক হাজারের বেশি বার্তা শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এসব বার্তায় প্রায় ৯৪ হাজার প্রতিক্রিয়া জমা পড়ে।
জুলাইয়ে একটি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের হামলার ঘটনাও ব্যবহার করা হয়। সেটিকে গোটা ব্রিটিশ বিদ্যুৎব্যবস্থার বিপর্যয়ের আশঙ্কা হিসেবে প্রচার করা হয়। গবেষকদের হিসাবে, আগস্টের চার দিনে এ নিয়ে ১১৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাব থেকে ৩৩৭টি বার্তা ছড়ায়। দেখা হয় প্রায় ১৯ লাখ বার। অথচ ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েনি।
ওসাভুলের মূল্যায়ন, এসব প্রচারের উদ্দেশ্য ব্রিটিশদের নিজেদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমানো এবং বাইরের বিশ্বে ব্রিটেনকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনকে ব্রিটেনের অব্যাহত সমর্থন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের পরিবর্তন এই প্রচারযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রুত ও কম খরচে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোও সহজ হয়েছে।
পুতিনবিরোধী আন্দোলনকর্মী বিল ব্রাউডার সতর্ক করেছেন, পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি বহুগুণ খারাপ হতে পারে। তার কথায়, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে এসব কাজে ব্যবহৃত হবে, তার শুরুটাও সম্ভবত আমরা এখনো দেখিনি।’
গবেষক কিয়ার জাইলসের মতে, মানুষের মনোভাব ধীরে ধীরে বদলানোই এমন প্রচারের লক্ষ্য।
ব্রিটিশ সরকার এর মধ্যে বিদেশি তথ্য-হামলা শনাক্ত ও প্রতিরোধে জাতীয় তথ্য প্রতিরক্ষাকেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। রুশ তথ্যযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।



