ইতালির অন্ধকার পৃথিবীতে নতুন সূর্য
- মাফিয়ার ছায়া থেকে সন্তানদের সরাতে ‘নতুন জীবন’ শুরুর ঐতিহাসিক আইন

নতুন সূর্য উঠতে চলেছে মাফিয়া সাম্রাজ্যের অভয়ারন্য ইতালির অন্ধকার জগতে- রয়টার্স
রক্তের সম্পর্ক কি মানুষের ভবিষ্যৎও লিখে দেয়? কোনও শিশুর জন্ম যদি এমন এক পরিবারে হয়, যেখানে ক্ষমতার ভাষা বন্দুক আর জীবনের পথচলা অপরাধের ছায়ায় আবদ্ধ - তাহলে কি তার ভাগ্যও আগেই নির্ধারিত? দক্ষিণ ইতালির বহু অঞ্চলে এই প্রশ্ন নতুন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাফিয়া সংগঠনগুলির ভিত মজবুত হয়েছে পরিবারকে কেন্দ্র করে। বাবার পর ছেলে, কাকার পর ভাতিজা - ক্ষমতা, প্রভাব এবং অপরাধের উত্তরাধিকার যেন রক্তের সঙ্গেই প্রবাহিত হয়েছে। সেই দীর্ঘস্থায়ী চক্র ভাঙতেই এবার এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিল ইতালি। ঐতিহাসিক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নতুন সূর্য উঠতে চলেছে মাফিয়া সাম্রাজ্যের অভয়ারন্য ইতালির অন্ধকার জগতে।
গত বুধবার দেশটির সংসদে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে ‘লিবেরি দি শেলিয়েরে’বা ‘বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা’ আইন। নতুন এই আইনের আওতায় মাফিয়া পরিবারের ২৫ বছরের কম বয়সী সন্তান এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অপরাধচক্র থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের নতুন শহরে স্থানান্তরিত করা হবে, নতুন স্কুলে ভর্তি করানো হবে, এমনকি নিরাপত্তার স্বার্থে দেওয়া হতে পারে নতুন পরিচয়ও।
ইতালির সংসদীয় অ্যান্টি-মাফিয়া কমিশনের সভাপতি কিয়ারা কলোসিমো আইনটি পাস হওয়ার পর বলেন, বহু বছর ধরে যে স্বপ্নকে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল, সংসদ সেটিকেই আইনের রূপ দিল। তাঁর অনুমান, প্রতিবছর প্রায় ৪০০ শিশু ও তরুণ এই কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে। এই আইন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতালির দীর্ঘ অপরাধ-ইতিহাসের বিরুদ্ধে এক সামাজিক ও নৈতিক অবস্থানও বটে।
ইতালির অপরাধজগতের ইতিহাসে সিসিলির কোসা নস্ত্রা, নেপলসের কামোরা এবং ক্যালাব্রিয়ার এনদ্রাঙ্গেতা বিশেষভাবে পরিচিত নাম। সব সংগঠনের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার নির্দিষ্ট নিয়মে নির্ধারিত না হলেও, এনদ্রাঙ্গেতার সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার গভীরভাবে প্রোথিত।
কারণ, ইতালির কুখ্যাত অপরাধচক্রগুলির মধ্যে বিশেষ করে ক্যালাব্রিয়ার এনদ্রাঙ্গেতা সংগঠনের শক্তির মূলেই রয়েছে পারিবারিক বন্ধন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই মাফিয়া নেটওয়ার্কে রক্তের সম্পর্ককে শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়, সংগঠনের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতার ভিত্তি হিসেবেও দেখা হয়। একজন মাফিয়া নেতার ছেলে ভবিষ্যতে গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নেবে - এমন প্রত্যাশা সেখানে প্রায় অলিখিত নিয়ম। এই কারণেই সংগঠনটিকে ভাঙা কঠিন। পুলিশের কাছে তথ্য দেওয়া বা আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া মানে কেবল অপরাধীদের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়; অনেক সময় নিজের বাবা, দাদা, কাকা কিংবা ভাইয়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো। ফলে অসংখ্য অভিযান, গ্রেফতার এবং শত শত অভিযুক্তকে নিয়ে হওয়া বৃহৎ বিচারপ্রক্রিয়ার পরেও সংগঠনটি টিকে থেকেছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা কারাগারে যাওয়ার পর তাদের জায়গা নিয়েছে কিশোর বা তরুণ উত্তরসূরিরা। যেন অপরাধও উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০১১ সালে রেজ্জিও ক্যালাব্রিয়ার কিশোর আদালতের প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রবার্তো দি বেলা এক সাহসী উদ্যোগ শুরু করেন। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাফিয়া পরিবারগুলির শিশুদের সেই পরিবেশ থেকে সরিয়ে এনে অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং মনোবিদদের সহায়তায় তাদের পড়াশোনা, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিক পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।
যেসব অভিভাবক সন্তানদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাখতে চাইতেন, তাদের ক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের অধিকার বাতিল করার ব্যবস্থাও নেওয়া হতো। ওই প্রকল্পে শিশুদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত নিরাপদ পরিবেশে রাখার ব্যবস্থা ছিল। লক্ষ্য ছিল, তারা যেন অপরাধচক্রের প্রভাব থেকে দূরে থেকে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেই কর্মসূচির নামই ছিল ‘ফ্রি টু চুজ’- আজ যা জাতীয় আইনের ভিত্তি হয়ে উঠেছে। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
বিচারক দি বেলাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, তিনি পরিবার ভেঙে দিচ্ছেন। কিছু রাজনীতিক, ভাষ্যকার এবং গির্জার প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, সন্তানদের পরিবার থেকে সরিয়ে নেওয়া পরিবারপ্রথার বিরুদ্ধে আঘাত।
এমনকি এক কারাবন্দি মাফিয়া নেতা তাঁকে পরোক্ষ হুমকিও দিয়েছিল। বার্তাটা ছিল সংক্ষিপ্ত - সবারই সন্তান আছে।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্য এক বাস্তবতা সামনে আসে। দি বেলার দাবি, এনদ্রাঙ্গেতা পরিবারের বহু মা গোপনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রভাবশালী মাফিয়া নেতাদের স্ত্রীরাও। অনেকেই নিজেদের ছেলেদের ক্যালাব্রিয়া থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কারণ তারা আশঙ্কা করতেন, বর্তমান পরিবেশে থাকলে তাদের ভবিষ্যৎ হয় কারাগারে, নয়তো মৃত্যুর মধ্যেই শেষ হবে।নতুন আইন সেই উদ্বেগকেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। আইন অনুযায়ী, মা যদি মাফিয়ার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে রাজি হন, তাহলে মা ও সন্তানকে একসঙ্গে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করা হবে। কিন্তু যদি মা অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, সেক্ষেত্রে শিশুদের যাচাই করা পালক পরিবারের কাছে অথবা বিশেষ সুরক্ষিত আবাসনে রাখা হবে। সেখানে শিক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। আইনটি পাস হওয়ার পর ইতালির বিশিষ্ট অ্যান্টি-মাফিয়া ধর্মযাজক ও সমাজকর্মী লুইজি চিয়োত্তি একে স্বাধীনতার জয় বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যারা মাফিয়া পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিসিলির গেলা শহরের প্রধান প্রসিকিউটর সালভাতোরে ভেলা-ও আইনটির প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মাফিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের অভিযান বা আদালতের বিচারের বিষয় নয়। এটি সংস্কৃতি, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম।
তবে আশঙ্কার জায়গাও রয়েছে। ভেলার মতে, নিরাপদ আবাসন, আর্থিক সহায়তা, নতুন পরিচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার দায়িত্ব যে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার ওপর পড়বে, সেটি ইতিমধ্যেই নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ, জনবল এবং বিশেষজ্ঞ সহায়তা ছাড়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবু ইতালির এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি আইন পাসের ঘটনা নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্রের বার্তা, যে রাষ্ট্র বিশ্বাস করতে চায় - কোনও শিশুর জন্ম তার নিয়তি নয়।
বহু দশক ধরে মাফিয়া পরিবারগুলিতে সন্তানদের শেখানো হয়েছে আনুগত্য, প্রতিশোধ আর ক্ষমতার উত্তরাধিকার। ইতালি এবার সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে অন্য এক সম্ভাবনার কথা বলছে। বলছে, একজন মানুষের পরিচয় তার পরিবারের অপরাধ নয়। তার ভবিষ্যৎও পূর্বনির্ধারিতও নয়। আর হয়তো সেই কারণেই এই আইনকে অনেকেই দেখছেন মাফিয়ার বিরুদ্ধে আরেকটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং অন্ধকার উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে স্বাধীন ভবিষ্যতের ঘোষণাপত্র হিসেবে।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন




