প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ালে ব্রিটেনের পাশে নেই যুক্তরাষ্ট্র
- ফকল্যান্ড ইস্যুতে ব্রিটেনকে ট্রাম্পের চাপ

আর্জেন্টিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রে থাকা ফকল্যান্ডকে এবার চাপের হাতিয়ার করার আলোচনা চলছে ওয়াশিংটনে।
প্রতিরক্ষায় আরও অর্থ ঢালো, না হলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেনকে দেওয়া কূটনৈতিক সুবিধাও পুনর্বিবেচনা হতে পারে, ঘনিষ্ঠ মিত্র লন্ডনের উপর এমনই চাপ তৈরির কথা ভাবছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকার যথেষ্ট দ্রুত এগোচ্ছে না বলে মনে করছেন পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। সেই অসন্তোষ থেকেই আর্জেন্টিনার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রে থাকা ফকল্যান্ডকে এবার চাপের হাতিয়ার করার আলোচনা চলছে ওয়াশিংটনে।
শুক্রবার ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো নতুন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করছে, তা পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেই পর্যালোচনায় ব্রিটেন ‘বিশেষ নজর’ পেতে পারে। কারণ ওয়াশিংটনের ধারণা, ইউরোপের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য ব্রিটেনের রয়েছে, কিন্তু সেই সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ ব্যয় করছে না দেশটি।
ব্রিটেনের আগের সরকার গত জুনে যে প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, সেটিকে ওয়াশিংটন ‘সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ’ বলে মনে করলেও তা যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ওই মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মাত্রা বিবেচনায় ব্রিটেনের মতো মিত্রকে আরও বড় ও মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
ফকল্যান্ড নিয়ে কী করতে পারে আমেরিকা
দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক অঞ্চল। কিন্তু আর্জেন্টিনা দ্বীপগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে এবং সেখানে ‘মালভিনাস’ নাম ব্যবহার করে। ১৯৮২ সালে দ্বীপগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ডের চূড়ান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও পক্ষ নেয় না; তবে দ্বীপগুলোর উপর ব্রিটিশ প্রশাসনকে স্বীকৃতি দেয়। ফলে ‘মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার’ বলতে সরাসরি ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি তুলে নেওয়া নয় বরং ওয়াশিংটনের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান আরও আর্জেন্টিনামুখী করা কিংবা ব্রিটিশ অবস্থানের বিরোধিতা করার সম্ভাবনাকেই বোঝানো হচ্ছে।
পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তাকে ফকল্যান্ড নিয়ে মার্কিন অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনও বিকল্পই পুরোপুরি নাকচ করেননি। তাঁর বক্তব্য, মিত্রদের মধ্যে প্রতিরক্ষার বোঝা ভাগাভাগি বাড়ানোর জন্য কী কী উপায় ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে।
বিষয়টি একেবারে নতুনও নয়। গত এপ্রিলেই পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ নথি ফাঁস হয়ে সামনে এসেছিল যে, ব্রিটেনের উপর চাপ তৈরির জন্য ফকল্যান্ড নিয়ে মার্কিন অবস্থান পুনর্বিবেচনার ধারণা আলোচিত হচ্ছে। তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পেন্টাগনের ভেতরে সেই আলোচনা এখনও বন্ধ হয়নি।
ন্যাটোর পাঁচ শতাংশের হিসাব
ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোকে এমন একটি নতুন কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা ‘ন্যাটো ৩.০’ বলছেন। এর মূল কথা, ইউরোপ ও কানাডাকে নিজেদের প্রচলিত প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিজেরাই নিতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক মনোযোগ আরও বেশি করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দিতে পারে।
ন্যাটোর সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ নিরাপত্তা-সম্পর্কিত খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে ৩.৫ শতাংশ সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে, আর আরও ১.৫ শতাংশ সামরিক ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত অবকাঠামোয় ব্যয়ের লক্ষ্য রয়েছে।
ব্রিটেনের বর্তমান পরিকল্পনা সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে। সরকারি হিসাবে, ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে মূল ন্যাটো প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২.৭ শতাংশে পৌঁছানোর কথা। জুনে ঘোষিত প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনায় চার বছরে প্রায় ২৯৮ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করা হয়েছে।
নিজের ঘোষিত তিন শতাংশ থেকেও সরছেন হিলি
এই মার্কিন চাপ এমন সময়ে এল, যখন ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জন হিলি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে নেওয়ার আগের লক্ষ্য আসন্ন বাজেটে কার্যত স্থগিত করতে চলেছেন। আগামী ২৮ অক্টোবর তাঁর প্রথম বাজেটে তিন শতাংশে পৌঁছানোর কোনও নির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকবে না বলে সরকারি সূত্রের খবর।
ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে আরও অস্বস্তিকর, কারণ গত জুনে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়ার সময় হিলি অভিযোগ করেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে ‘অক্ষম’ এবং ট্রেজারি সেই অর্থ দিতে ‘অনিচ্ছুক’। পরে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর হিলিই অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এখন অর্থনৈতিক চাপের মুখে তিন শতাংশের সময়সীমা থেকে তাঁর সরে আসা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
হিসাবটিও ছোট নয়। প্রতিরক্ষা ব্যয় তিন শতাংশে নিতে বছরে প্রায় অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন পাউন্ড, আর ৩.৫ শতাংশে নিতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন পাউন্ড বেশি প্রয়োজন হতে পারে। সরকার আপাতত বড় সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের ব্যয় পর্যালোচনা পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে চাইছে।
ব্রিটেনকে আলাদা করে চাপ কেন
বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকের পর পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারক এলব্রিজ কলবি ব্রিটেনকে প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জার্মানি, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ব্রিটেনের মতো দেশের কাছ থেকে ‘আরও’ দেখতে চায় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য, ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব ধীরে ধীরে ইউরোপীয় মিত্রদের হাতেই তুলে দেওয়া, যাতে মহাদেশটির নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সেনা ও অস্ত্রের উপর নির্ভরতা কমে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপে নিজের সেনা উপস্থিতি কীভাবে বদলাবে, সেটিও পর্যালোচনা করছে। ন্যাটো দেশগুলোকে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, তারা কত মার্কিন অস্ত্র কিনতে চায়, নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের উপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কি না এবং ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা সমর্থন করেছে। এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে ইউরোপে কত মার্কিন সেনা থাকবে, কোথায় থাকবে এবং কত দ্রুত পরিবর্তন আনা হবে, তার চারটি বিকল্প ৬ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে যাওয়ার কথা।
পটভূমিতে রয়েছে রাশিয়ার হুমকিও। সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হয়েছে, ন্যাটোর সংকল্প পরীক্ষা করতে রাশিয়া জোটের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে দ্রুত কোনও পদক্ষেপ নিতে পারে। পশ্চিমা কর্মকর্তারাও ইউরোপে রাশিয়ার নাশকতামূলক ও ‘হাইব্রিড’ কর্মকাণ্ড থেকে ভুল হিসাবের মাধ্যমে বড় সংঘাত বেধে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলছেন।
ফকল্যান্ডের উপর নিজেদের অবস্থান অবশ্য বদলায়নি লন্ডন। ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য, দ্বীপগুলো ব্রিটিশ বৈদেশিক অঞ্চল এবং সেখানকার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষা করা হবে। ব্রিটেনের সরকারি প্রতিরক্ষা কৌশলেও ফকল্যান্ডে সামরিক প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বজায় রাখার অঙ্গীকার রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক কয়েক দশকের। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বার্তা সেই ‘বিশেষ সম্পর্ক’-এর মধ্যেই কঠিন হিসাব ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ফকল্যান্ড নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনও বদলায়নি; কিন্তু সেই বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জকেই যদি ন্যাটোর খরচ আদায়ের দর-কষাকষির অস্ত্র করা হয়, তবে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিরোধ আর শুধু বাজেটের অঙ্কে আটকে থাকবে না, তা গিয়ে ঠেকবে ব্রিটেনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে।







