দাবদাহে দাউদাউ ইংল্যান্ডের স্টুরব্রিজ

সংগৃহীত ছবি
বছরের সবচেয়ে উষ্ণ দিনের ভয়াবহ দাবদাহের মধ্যেই আগুনের গ্রাসে ইংল্যান্ডের স্টুরব্রিজ। গলফ কোর্সের কাছের শুকনো ঘাসের জমি থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুন বৃহস্পতিবার বিকেলে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের এই শহরের আবাসিক এলাকায় পৌঁছে যায়। একের পর এক বাড়িতে ছড়ায় লেলিহান শিখা। ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা, আকাশ থেকে রাস্তায় ঝরতে থাকে ছাই। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ঘটনাস্থলে প্রায় ১০০ দমকলকর্মী কাজ করছেন।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস ফায়ার সার্ভিসের প্রধান সাইমন টুহিল জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মোকাবিলা করা সবচেয়ে গুরুতর অগ্নিকাণ্ডগুলোর একটি এটি। ক্ষয়ক্ষতিও ‘ব্যাপক’ বলে তার মন্তব্য।
দমকল বিভাগ প্রথম আগুনের খবর পায় বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টার কিছু আগে। স্টুরব্রিজ গলফ ক্লাবের কাছে শুরু হওয়া আগুন দ্রুত প্রায় ৪০ একর বা ১৬ হেক্টর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে ১২টি দমকল ইঞ্জিন ও প্রায় ৬০ জন কর্মী পাঠানো হয়। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে পরে কর্মীর সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ১০০ করা হয়।
আগুন রেসকোর্স লেন, মোরটন রোড, আইভারলি লেন, নর্টন রোডসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ছয়টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি বাড়িতে আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে সেগুলোর বড় অংশ পুড়ে যায়।
অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে গিয়ে অসুস্থ হয়েছেন দমকলকর্মীরাও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক শিশু ও তিন দমকলকর্মীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ধোঁয়ায় অসুস্থ আরও কয়েকজনকে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্থানীয় এমপি ক্যাট একলেস জানিয়েছেন, গুরুতর আহত হওয়ার কোনও খবর তাঁর কাছে নেই। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে এমন মানুষের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে, যাঁরা চোখের সামনে নিজেদের বাড়ি পুড়ে যেতে দেখেছেন।
আগুনের গতি এত দ্রুত ছিল যে বহু বাসিন্দাকে তড়িঘড়ি ঘর ছাড়তে হয়। বয়স্কদের একটি পরিচর্যাকেন্দ্র থেকেও বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের জন্য স্টুরব্রিজ টাউন হলকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেওয়া হয়েছে। যাঁরা নিজেরা সেখানে পৌঁছতে পারছেন না, তাঁদের পরিবহণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আতঙ্কের ছবি। তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ধোঁয়া এতটাই ঘন ছিল যে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ধরে রাস্তায় ছাই পড়তে দেখা যায়। বাতাসে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত কণা নতুন এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও বাড়ায়।
ধোঁয়া ও আগুনের কারণে এলাকার কয়েকটি রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। স্থানীয় পরিবহণ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়ে। জরুরি পরিষেবার কর্মীদের নিরাপদে কাজ করার সুযোগ দিতে সাধারণ মানুষকে সংশ্লিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দমকলপ্রধান টুহিল জানিয়েছেন, আগুন ছড়ানোর পর তাঁদের নিয়ন্ত্রণকক্ষে জরুরি নম্বর ৯৯৯ থেকে হাজার হাজার ফোন আসে। আগুনের প্রধান অংশ নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরো এলাকা নিরাপদ করতে আরও সময় প্রয়োজন। কয়েক দিন পর্যন্ত ঘটনাস্থলে দমকল ও অন্য জরুরি পরিষেবার উপস্থিতি থাকতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্টুরব্রিজের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দিনেই যুক্তরাজ্যে চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। বৃহস্পতিবার পশ্চিম লন্ডনের কিউ গার্ডেনে পারদ ওঠে ৩৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়া অফিসের প্রাথমিক হিসাবে, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এটি অন্যতম উষ্ণ দিন।
চলতি বছর এ নিয়ে চার দিন ব্রিটেনে তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করেছে। দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়া ও টানা উচ্চ তাপমাত্রায় ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় ঘাস ও গাছপালা অত্যন্ত শুকিয়ে যাওয়ায় দাবানলের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।
স্টুরব্রিজই একমাত্র এলাকা নয়। একই দিনে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। স্টোক-অন-ট্রেন্টে বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পার্শোরে প্রায় ৩০টি বাড়ি খালি করা হয় এবং কয়েকশো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়ারউইকশায়ারের সালফোর্ড প্রায়র্সে বড় অগ্নিকাণ্ডের জেরে ‘মেজর ইনসিডেন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
সরকারও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের মেয়র রিচার্ড পার্কারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগ হয়েছে। প্রয়োজন হলে দমকল ও স্থানীয় জরুরি পরিষেবাকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কাজ করা দমকলকর্মীদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছে সরকার।
আগুন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া চলতে থাকলে ব্রিটেনে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। সরাসরি আগুনের শিখার পাশাপাশি বাতাসে উড়ে যাওয়া জ্বলন্ত কণা দূরের বাড়ি বা শুকনো জমিতেও নতুন করে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
শুক্রবার তাপমাত্রা কিছুটা কমার পূর্বাভাস থাকলেও স্টুরব্রিজসহ ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে পারদ এখনও ৩০ ডিগ্রির উপরে থাকতে পারে। সপ্তাহান্তে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের অনেক এলাকাতেও গরম অব্যাহত থাকার আশঙ্কা।
দাবদাহের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার অপেক্ষায় এখন স্টুরব্রিজ। তবে যাঁরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আগুন নিভলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কতটা সময় লাগবে।






