অভিবাসী কর্মীদের পক্ষে একজোট ব্রিটেনের ইউনিয়নগুলো
- স্বাস্থ্য-সামাজিক পরিচর্যা কর্মীদের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রস্তাব ঘিরে ক্ষোভ
- টিইউসির দাবি, পুরনো নিয়মে আসা কর্মীদের ক্ষেত্রে ‘গোলপোস্ট’ সরানো যাবে না

ব্রাইটনে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে প্রতিনিধিরা সরকারের পরিকল্পিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ সংস্কারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করেন।
ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন কি পথের মাঝখানে বদলে দেওয়া যায়? পাঁচ বছর কাজ করে স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়ার প্রত্যাশায় যারা হাসপাতাল, কেয়ার হোম ও জনসেবায় কাজ করছেন, তাদের একাংশকে এখন অপেক্ষা করতে হতে পারে ১৫ বছর। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধেই সরব হয়েছে ব্রিটেনের বড় ট্রেড ইউনিয়নগুলো; সরকারের কাছে তাদের দাবি, অন্তত যারা ইতিমধ্যে দেশে এসে পুরনো নিয়মে জীবন গুছিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম বদলানো যাবে না।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাইটনে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে প্রতিনিধিরা সরকারের পরিকল্পিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ সংস্কারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস করেন। বর্তমানে অধিকাংশ বিদেশি কর্মী পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ‘ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন’ পেতে পারেন। নতুন পরিকল্পনায় সাধারণ অপেক্ষার সময় দ্বিগুণ হয়ে ১০ বছর হবে; স্বাস্থ্য ও সামাজিক পরিচর্যা ভিসায় থাকা অনেক কর্মীর ক্ষেত্রে তা ১৫ বছর, আর ১২ মাসের বেশি রাষ্ট্রীয় সুবিধার ওপর নির্ভর করলে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
এই পরিবর্তন ইতিমধ্যে স্থায়ী বসবাস পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা এবং কয়েক মাসের মধ্যেই পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কর্মীরাও নতুন ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারেন, ইউনিয়নগুলোর আপত্তির কেন্দ্র এখানেই। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন ইউনিসন বলেছে, এতে অভিবাসী কর্মীদের “দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক” বানানোর ঝুঁকি রয়েছে।
ইউনিসনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ডেবি রাউডেন কংগ্রেসে বলেছেন, সরকার ব্যাংকারদের জন্য দ্রুততর বসবাসের পথ রাখতে চাইছে, অথচ সামাজিক পরিচর্যা কর্মীদের অপেক্ষা করাতে চায় ১৫ বছর। তার প্রশ্ন, “এতে জনসেবা কর্মীদের মূল্য সম্পর্কে কী বার্তা যায়?” ইউনিসনের দাবি, এই নীতি বিদেশি কর্মীদের দূরে ঠেলে দেবে এমন সময়ে, যখন কেয়ার, নার্সিং, স্বাস্থ্য সহকারী, শিশু আবাসিক পরিচর্যা ও প্রবেশন সেবায় কর্মীসংকট রয়েছে।
সোসাইটি অব রেডিওগ্রাফার্সও প্রস্তাবটির পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীরা এনএইচএসের বড় শূন্যতা পূরণ করেছেন; কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আন্তর্জাতিক টেকনিশিয়ানের সংখ্যা ১২ শতাংশ, অর্থাৎ দেড় হাজারেরও বেশি কমেছে। তাদের ভাষ্য, স্থায়ী হওয়ার “গোলপোস্ট” সরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা কর্মীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
টিইউসির সাধারণ সম্পাদক পল নওয়াক এর আগে সংস্কারগুলোকে “মৌলিকভাবে অন্যায্য” বলে সতর্ক করেছিলেন। তার মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে যাঁদের ব্রিটেনের সেবা খাত বাঁচাতে ডাকা হয়েছিল, তাদের প্রতিশ্রুত পাঁচ বছরের পথ এখন দীর্ঘ করা হলে তা আস্থা ও একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
লেবার দলের ভেতরেও আপত্তি রয়েছে। বর্তমান আবাসনমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার, মন্ত্রী হওয়ার আগে, পরিকল্পনাটিকে “আন-ব্রিটিশ” বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং বলেছিলেন, মাঝপথে নিয়ম পাল্টানো ব্রিটিশ ‘ফেয়ার প্লে’-এর ধারণাকে দুর্বল করে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও তখন তার উদ্বেগ বোঝার কথা বলেছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ অবশ্য আগে বলেছেন, যুক্তরাজ্যে “অভূতপূর্ব” সংখ্যায় মানুষ আসার বাস্তবতার উত্তর সরকারকে দিতেই হবে। সরকার জানিয়েছে, পরামর্শ প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই লাখ মতামত এসেছে এবং সেগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে; এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রস্তাব কার্যকর হলে বাংলাদেশিসহ বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা বহু বিদেশি স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা কর্মীর পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে, তাঁদের ভিসা ও পেশাগত শ্রেণির ওপর নির্ভর করে। তাই বিতর্কটি শুধু অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নয়; ব্রিটেনের হাসপাতাল ও কেয়ার ব্যবস্থা ভবিষ্যতে কাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, সেই প্রশ্নও এখন একই টেবিলে।
হাউস অব কমন্স লাইব্রেরিও জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অভিবাসন শ্বেতপত্রে স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা কঠোর করার প্রস্তাব রাখা হলেও এই নির্দিষ্ট দীর্ঘতর অপেক্ষার বিধান এখনও কার্যকর হয়নি। অর্থাৎ বিতর্কটি বর্তমানে নীতিগত ও পরামর্শপর্বে আছে। ইউনিয়নগুলোর চাপের লক্ষ্য তাই আইন কার্যকর হওয়ার আগেই সরকারকে পিছু হটানো বা অন্তত পুরনো নিয়মে আসা কর্মীদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা।



