কঠিনতর হচ্ছে আইরিশ নাগরিকত্ব পাবার প্রক্রিয়া

নতুন প্রস্তাবের আরেকটি আলোচিত দিক হলো ইংরেজি ভাষাজ্ঞান। ছবি: আইরিশ টাইমস
আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসীর জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। আইরিশ নাগরিকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে বর্তমানে যে পাঁচ বছরের বসবাসের শর্ত রয়েছে, তা বাড়িয়ে আট বছর করার প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, আর্থিক সক্ষমতা এবং অতীতের কর্মকাণ্ডের আরও কঠোর যাচাইয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। তবে এখনই এটিকে নতুন আইন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি বর্তমানে সরকারের নীতিগত বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
২২ আগস্ট ২০২৬-এ প্রকাশিত দ্য সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে, আয়ারল্যান্ডের অভিবাসনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কলম ব্রফি নাগরিকত্বের নিয়ম কঠোর করার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে একটি সরকারি প্রস্তাবণা হিসেবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ক্যাবিনেটে উপস্থাপন করা হবে। এরপর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কোন কোন পরিবর্তন কার্যকর করা হবে এবং কোন পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান আইন সংশোধন করতে হবে। অর্থাৎ বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি এখনো পার্লামেন্টে চূড়ান্তভাবে পাস হওয়া কোনো আইন নয়।
বর্তমান আইরিশ নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেতে সাধারণত আবেদনকারীকে গত নয় বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচ বছর রিকগনেবল রেসিডেন্স বা গণনাযোগ্য বৈধ বসবাস সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে আবেদন করার ঠিক আগের এক বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে আয়ারল্যান্ডে বসবাসের শর্ত রয়েছে। আইরিশ সরকারের সরকারি নির্দেশনাতেও এই পাঁচ বছরের নিয়ম বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে এই হিসাব আমূল বদলে যেতে পারে। পাঁচ বছরের পরিবর্তে আট বছর পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে বসবাসের প্রয়োজন হলে বিদেশি নাগরিকদের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের যুক্তি হলো, নাগরিকত্ব কেবল একটি প্রশাসনিক সুবিধা নয়, এটি এমন ব্যক্তিদের দেওয়া উচিত যারা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং দেশটির সমাজ ও অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়েছেন। সেই কারণেই নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জনের আগে দীর্ঘ সময়ের বসবাস নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রভাব আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য যথেষ্ট বড় হতে পারে। বর্তমানে পাঁচ বছর পূর্ণ করে যারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন যে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের ওপর সেটি প্রযোজ্য হবে কি না। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডে কাজ করছেন, কর দিচ্ছেন, পরিবার গড়েছেন এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাদের জন্য নাগরিকত্বের পথ আরও কয়েক বছর দীর্ঘ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন প্রস্তাবের আরেকটি আলোচিত দিক হলো ইংরেজি ভাষাজ্ঞান। বর্তমানে আইরিশ নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যুক্তরাজ্য বা ইউরোপের অনেক দেশের মতো একটি নির্দিষ্ট ভাষা পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু সরকার এখন আবেদনকারীদের ইংরেজিতে যোগাযোগের সক্ষমতা যাচাই করার ব্যবস্থা চালুর কথা বিবেচনা করছে। আয়ারল্যান্ডের সরকারি ভাষা আইরিশ ও ইংরেজি হলেও দেশের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগে ইংরেজির ব্যবহার ব্যাপক। তাই নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের ইংরেজি ভাষায় মৌলিক যোগাযোগের সক্ষমতা থাকা উচিত এমন যুক্তিই সামনে আনা হচ্ছে। তবে পরীক্ষার ধরন, কোন স্তরের ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন হবে এবং কারা এই শর্ত থেকে অব্যাহতি পাবেন, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক সক্ষমতা। সরকারের বিবেচনায় থাকা পরিকল্পনা অনুযায়ী, নাগরিকত্বের আবেদনকারীকে নিজের এবং প্রয়োজনে পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করার সক্ষমতা দেখাতে হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থান থাকা, নিজস্ব আয় এবং নির্দিষ্ট ধরনের সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থাকার বিষয়গুলো ভবিষ্যতে নাগরিকত্বের যোগ্যতা নির্ধারণে গুরুত্ব পেতে পারে। সরকারের দৃষ্টিতে এর মাধ্যমে এমন আবেদনকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে যারা আয়ারল্যান্ডে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়।
এই প্রস্তাব অবশ্য নতুন বিতর্কও তৈরি করতে পারে। কারণ আয়ারল্যান্ড বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম ব্যয়বহুল আবাসন বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিশুদের ডে-কেয়ারসহ বিভিন্ন পরিষেবার খরচ অনেক পরিবারকে আর্থিক চাপে ফেলেছে। ফলে সামাজিক সহায়তা গ্রহণের বিষয়টিকে নাগরিকত্বের যোগ্যতার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সাময়িক বেকারত্ব, অসুস্থতা, পরিবারে শিশু থাকা কিংবা আবাসন সংকটের কারণে কেউ সামাজিক সহায়তা নিলে তার নাগরিকত্বের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেটিও ভবিষ্যতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা ও সৎ চরিত্র যাচাই আরও কঠোর করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনার অংশ। বর্তমানে নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের অতীতের অপরাধমূলক রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় এই যাচাই আরও বিস্তৃত ও কঠোর হতে পারে। সরকারের যুক্তি, আইরিশ নাগরিকত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা এবং এটি দেওয়ার আগে আবেদনকারীর পরিচয়, অতীত কর্মকাণ্ড এবং আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
নাগরিকত্বের আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধিও সরকারের এই নতুন উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। আইরিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৩০ হাজারের বেশি নাগরিকত্বের আবেদনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের মার্চে স্থানীয় সর্ব বৃহৎ গণমাধ্যম আরটিই জানায়, ২০২৪ ও ২০২৫ দুই বছরেই প্রায় ৩১ হাজার করে নাগরিকত্বের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। এই বিপুল সংখ্যক আবেদন আয়ারল্যান্ডে অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরও একটি চিত্র তুলে ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ এখন দেশটির শ্রমবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, নির্মাণ, আতিথেয়তা, পরিবহন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছেন। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডে বসবাস করে দেশটির অর্থনীতি ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। নাগরিকত্বের মাধ্যমে তারা ভোটাধিকারসহ পূর্ণ নাগরিক অধিকার লাভের সুযোগ পান এবং নিজেদের ভবিষ্যৎকে আরও স্থায়ীভাবে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন।
২০২৫ সালের জুনে কিলার্নিতে অনুষ্ঠিত নাগরিকত্ব অনুষ্ঠানে ১৪৩টির বেশি দেশের ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ আইরিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৬ সালের জুনেও কিলার্নিতে দুই দিনের অনুষ্ঠানে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মানুষ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তারা এসেছিলেন ১৩৯টিরও বেশি দেশ থেকে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা কতটা বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক চরিত্র ধারণ করেছে। তবে নাগরিকত্বের নিয়ম পরিবর্তনের আলোচনা শুধু সাধারণ অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা আশ্রয় পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিদের সাধারণভাবে নাগরিকত্বের আবেদনের আগে পাঁচ বছর পূরণ করতে হচ্ছে। এর আগে এই শ্রেণির আবেদনকারীদের জন্য তিন বছরের বিশেষ শর্ত ছিল। এই পরিবর্তন নিয়ে শরণার্থী ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন অপেক্ষার শর্ত নাগরিকত্বের মাধ্যমে সমাজে দ্রুত একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে। বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে আয়ারল্যান্ডে কাজ করছেন, কর দিচ্ছেন এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাদের নাগরিকত্বের পথ দীর্ঘ হওয়ার ফলে সামাজিক সংযুক্তির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থান হলো, নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে একজন আবেদনকারীর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যথেষ্ট দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক থাকা উচিত। সরকার মনে করছে, নাগরিকত্বের মানদণ্ড আরও পরিষ্কার ও কঠোর হলে প্রক্রিয়াটির প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়তে পারে এবং নাগরিকত্বের মর্যাদাও আরও সুস্পষ্ট হবে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো নতুন নিয়ম কবে কার্যকর হবে এবং বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত অভিবাসীদের ওপর এর প্রভাব কী হবে? এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ প্রস্তাবিত আট বছরের শর্ত এখনো আইন নয়। আগামী কয়েক মাসে ক্যাবিনেটে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যদি আইন সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি পার্লামেন্টের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পাঁচ বছরের নিয়মই কার্যকর থাকবে। ফলে আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি ঘোষণার দিকে নজর রাখা। যারা নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জন করেছেন বা শিগগিরই যোগ্য হতে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন আইন কার্যকর হলে পরিবর্তনকালীন ব্যবস্থা কী থাকবে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় সম্ভাব্য এই পরিবর্তন দেশটির অভিবাসননীতিতে একটি বড় মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সরকার নাগরিকত্বকে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, অন্যদিকে হাজার হাজার অভিবাসীর জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে আয়ারল্যান্ডে নাগরিকত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামো।
এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো আইরিশ নাগরিকত্বের নিয়ম বদলের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু নতুন আইন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পাঁচ বছর থেকে আট বছরের সম্ভাব্য পরিবর্তন, ভাষাজ্ঞান, আর্থিক সক্ষমতা ও কঠোর ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই এসব প্রস্তাব বাস্তবে কতটা রূপ নেবে, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক মাসের সরকারি সিদ্ধান্তে।






