ব্রিটেনে ‘চিকেন টিক্কা মাশালা’ হারালো শীর্ষ স্থান

চিকেন টিক্কা মাসালা, যাকে যুক্তরাজ্যের ‘অনানুষ্ঠানিক জাতীয় খাবার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ব্রিটিশ বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট মালিকদের দীর্ঘদিনের গর্বের চিকেন টিক্কা মাসালাকে যুক্তরাজ্যের ‘অনানুষ্ঠানিক জাতীয় খাবার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পিৎজা, বার্গার এবং ফিশ অ্যান্ড চিপসও ব্রিটিশদের জনপ্রিয় টেকঅ্যাওয়ে খাবারের তালিকায় রয়েছে। তবে চলতি গ্রীষ্মে এসব খাবারকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে জনপ্রিয় টেকঅ্যাওয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে চিকেন শর্মা র্যাপ।
অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেলিভারু তাদের প্রথম বার্ষিক পুরস্কারে চিকেন শর্ম্ র্যাপকে ‘টেকঅ্যাওয়ে অব দ্য সামার ২০২৬’ ঘোষণা করেছে।
ডেলিভারুর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি গ্রীষ্মে চিকেন শর্মা অর্ডার ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় খাবারটিকে ব্রিটেনের গ্রীষ্মকালীন টেকঅ্যাওয়ে তালিকার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
পোর্টসমাউথে মাসালা লাউন্জ রেস্টুরেন্টের মালিক আবু নাসের চৌধুরী জানান, ব্রিটেনে বাংলাদেশী মালিকানাধীন ১০ হাজার রেস্টুরেন্টের মূল মার্কেটিংই ছিলো এই চিকেন টিক্কা মাসালার শীর্ষত্ব! সেটি হারানো মানে ব্রিটিশ ভোজন রসিকদের মধ্যে ইন্ডিয়ান খাবার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। এটি আমাদের বিজনেসের জন্য ক্ষতিকার।
ঐতিহ্যগতভাবে মসলায় মাখানো মাংস একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে লম্বা ও ঘূর্ণায়মান শিকে ধীরে ধীরে ভেজে শর্মা তৈরি করা হয়। এরপর মাংসের বাইরের অংশ পাতলা করে কেটে ফ্ল্যাটব্রেডে পরিবেশন করা হয়। এর সঙ্গে সাধারণত রসুনের সস, সালাদ এবং কখনো কখনো চিপস দেওয়া হয়। খাবারটির নিরামিষ সংস্করণসহ বিভিন্ন উপকরণ যোগ করার সুযোগও থাকে।
ডেলিভারুর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চিকেন শর্মা মূলত সন্ধ্যার খাবার হিসেবেই বেশি জনপ্রিয়। সন্ধ্যা সাতটার দিকে এর অর্ডার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং শুক্রবারে সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে।
ডেলিভারুর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জেফ ওয়েমিস বলেন, “বহু বছর ধরে চিকেন শর্মা ছিল রাত ১১টার নির্ভরযোগ্য ও সুস্বাদু খাবার। কিন্তু চলতি গ্রীষ্মে এটি মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাধীন রেস্তোরাঁ ও গ্রিল শপ বহু বছর ধরে কয়েক প্রজন্মের রান্নার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই খাবার পরিবেশন করে আসছে। তাই ডেলিভারুর ‘টেকঅ্যাওয়ে অব দ্য সামার ২০২৬’ পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে যোগ্য খাবার আর হতে পারে না।
ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রেস্তোরাঁ, পারিবারিক গ্রিল শপ ও স্ট্রিট ফুডের দোকানে দীর্ঘদিন ধরেই শর্মা বিক্রি হচ্ছে। তবে সম্প্রতি মূলধারার খাবারের বাজারে এর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন অনেক রেস্তোরাঁয় বার্গার ও পিৎজার পাশাপাশি শর্মাও নিয়মিত রাখা হচ্ছে।
ডেলিভারুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে শর্মা বিক্রি করা রেস্তোরাঁগুলোর অর্ধেকের বেশি গত বছর খাবারটি বিক্রি করত না।
বিশ্লেষকদের ধারণা, গ্রীষ্মে শর্মার চাহিদা বৃদ্ধিতে ফুটবলও ভূমিকা রেখেছে। খেলা দেখার সময় একটি শর্মা র্যাপ ও ঠান্ডা পানীয় অনেকের পছন্দের খাবারে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে রেকর্ড তাপপ্রবাহের কারণে মানুষ হয়তো তুলনামূলক বেশি ঝাল ও ভারী খাবারের পরিবর্তে শর্মা বেছে নিয়েছেন।
তবে শর্মার এই জনপ্রিয়তাকে ক্ষণস্থায়ী খাদ্যপ্রবণতা বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি কোনো সাম্প্রতিক খাবার নয় এটি। শর্মার ইতিহাস উনিশ শতকের অটোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। তুরস্কের ডোনার কাবাব থেকে ধীরে ধীরে বর্তমান শর্মার বিকাশ হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও তুরস্ক থেকে অভিবাসন বৃদ্ধির ফলে ১৯৭০-এর দশক এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে শর্মা ও ঘূর্ণায়মান শিকে ভাজা অন্যান্য মাংসের খাবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ওই সময়ে লন্ডনের এজওয়্যার রোড আরব ও লেভান্ট অঞ্চলের খাবারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
চিকেন শর্মা চলতি গ্রীষ্মের সেরা টেকঅ্যাওয়ের স্বীকৃতি পেলেও এর সাফল্য হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো উন্মাদনা নয়। বরং কয়েক দশক ধরে ব্রিটেনে থাকা একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার অবশেষে মূলধারায় প্রাপ্য স্বীকৃতি পাচ্ছে। তাই গ্রীষ্ম শেষ হয়ে আবহাওয়া ঠান্ডা হলেও এর জনপ্রিয়তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম।






