যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অনুদান নিয়ে বিতর্ক কেন

ছবি: রয়টার্স
রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন কে করে, আর কেন ধনী ব্যক্তি, কোম্পানি বা বিভিন্ন সংগঠন নির্দিষ্ট প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে—এই প্রশ্নটি যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যুগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। নীতিগতভাবে, ভোটাররা তাদের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে অনুদান বা অন্যান্য উপায়ে সহায়তা করতে পারেন, যদি নির্বাচনী ব্যয় আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে। এই সীমার উদ্দেশ্য হলো শক্তিশালী আর্থিক গোষ্ঠীগুলো যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধনী দাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিদ্যমান নিয়মগুলো যথেষ্ট সুরক্ষা দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলো মূলত ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠনের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া সদস্য ফি, দলীয় সম্মেলন এবং সরকারি সহায়তা থেকেও আয় করে। এর মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলগুলোর জন্য দেওয়া ‘শর্ট মানি’ও রয়েছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধিত ব্রিটিশ ভোটার, যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত ও বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী কোম্পানি, ট্রেড ইউনিয়ন এবং নির্দিষ্ট কিছু অনিবন্ধিত সংগঠন রাজনৈতিক দলকে ৫০০ পাউন্ডের বেশি এবং প্রার্থীকে ৫০ পাউন্ডের বেশি অনুদান দিতে পারে। ২০০০ সালে প্রণীত স্বচ্ছতা আইনের আওতায় দলগুলোকে দাতার পরিচয়, অনুদানের পরিমাণ এবং প্রদানের তারিখ প্রকাশ্য নিবন্ধনে উল্লেখ করতে হয়। এক বছরে ১১ হাজার ১৮০ পাউন্ডের বেশি অনুদান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হয়।
রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে, কারণ এখন অনেক ‘মেগা-ডোনার’ একাই কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দিচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, এত বড় অঙ্কের অনুদান এমন ধারণা তৈরি করে যে ধনী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অসম মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ লাখ পাউন্ড বা তার বেশি অনুদান দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবদান ২০১৫ সালে মোট রাজনৈতিক অনুদানের মাত্র ১ শতাংশ ছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের আগে কনজারভেটিভ পার্টি বড় দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি পাউন্ড পেয়েছিল। অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ক্রিস্টোফার হারবর্নের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড এবং আরেক ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী বেন ডেলোর কাছ থেকে ৪০ লাখ পাউন্ড পেয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অনুদানের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের দাবি জোরালো হয়েছে। লেবার পার্টির সংসদ সদস্য স্টেলা ক্রিজি বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ পাউন্ড অনুদানের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। একই দলের আরেক সদস্য অ্যালেক্স সোবেল ১০ লাখ পাউন্ড সীমা নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সরকার এখন পর্যন্ত সামগ্রিক কোনো সীমা আরোপে রাজি হয়নি। তাদের যুক্তি, ব্যক্তি যেন ইচ্ছামতো অনুদান দিতে পারেন। এদিকে, ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের কারণে লেবার পার্টি অনুদানের সীমা আরোপে অনাগ্রহী বলে অভিযোগ রয়েছে। জিএমবি ইউনিয়নও সতর্ক করে বলেছে, অনুদানের সীমা নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ট্রেড ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনুদানের ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ পাউন্ডের সীমা নির্ধারণ করেছে।
বর্তমান ব্যবস্থার সমর্থকেরা ‘স্বেচ্ছা অর্থায়ন’ নীতির কথা উল্লেখ করেন। এই নীতিতে নাগরিকেরা করদাতাদের অর্থের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আর্থিক সহায়তা দিতে পারেন। হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির মতে, এই ব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখে। তবে সমালোচকদের মতে, অল্প কয়েকজন ধনী দাতার ওপর নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন তোলে।
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ সংসদে প্রবেশের অল্প আগে থাইল্যান্ডভিত্তিক ক্রিপ্টো ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবর্নের কাছ থেকে ৫০ লাখ পাউন্ডের উপহার পাওয়ার ঘটনায় স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফারাজের দাবি, এটি ছিল ব্যক্তিগত উপহার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। তাই এটি ঘোষণা করার প্রয়োজন ছিল না। তবে সংসদের মানদণ্ডবিষয়ক কমিশনার বিষয়টি তদন্ত করছেন এবং নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
সংসদ সদস্যদের দায়িত্বসংক্রান্ত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাওয়া ৩০০ পাউন্ডের বেশি মূল্যের উপহার বা সুবিধা ঘোষণা করতে হয়। ৫০০ পাউন্ডের বেশি মূল্যের উপহার অবশ্যই অনুমোদিত উৎস থেকে আসতে হবে। কোনো সংসদ সদস্যের দায়িত্বের কারণে তার পরিবারের সদস্যরা উপহার পেলে সেটিও নিবন্ধন করতে হয়। কেবল ব্যক্তিগত উপহার সাধারণত ঘোষণা করতে হয় না। তবে দাতার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা নিবন্ধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে ১২ মাসে পাওয়া প্রাসঙ্গিক আর্থিক সুবিধা ও চলমান আর্থিক স্বার্থও সংসদ সদস্যদের ঘোষণা করতে হয়।
অনুদানের সর্বোচ্চ সীমা থাকলে নাইজেল ফারাজ ৫০ লাখ পাউন্ডের উপহারটি গ্রহণ করতে পারতেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত এটি যদি ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে রাজনৈতিক অনুদানের নিয়মের আওতায় নাও পড়তে পারে। তবে রাজনৈতিক অনুদানের ওপর সামগ্রিক সীমা থাকলে ক্রিস্টোফার হারবর্ন ও বেন ডেলোর রিফর্ম ইউকেকে দেওয়া কোটি কোটি পাউন্ডের অনুদান এবং কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির পাওয়া বড় অঙ্কের অনুদান উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে যেত।




