ডিগ্রি হাতে, চাকরি নেই!
ব্রিটেনে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সংকুচিত হচ্ছে সুযোগ

ব্রিটেনে এক বছর আগের তুলনায় গ্র্যাজুয়েট চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন দেখছেন হাজার হাজার তরুণ। কিন্তু সেই পথ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে ব্রিটেনে। নতুন এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটিতে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য নতুন চাকরির সুযোগ এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে। চাকরির বাজারে এমন মন্দার সময়ে এ বছর রেকর্ড সংখ্যক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ফলে আগামী দিনে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চাকরি খোঁজার ওয়েবসাইট অ্যাডজুনা-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ব্রিটেনে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিজ্ঞাপিত চাকরির সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮ হাজার ৩৮৩টিতে। ২০১৬ সালে এই হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর এটাই সর্বনিম্ন। এক বছর আগের তুলনায় গ্র্যাজুয়েট চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
এই পতনের সময়েই ব্রিটেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৮২০ জন তরুণ। ফলে একদিকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের আগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের রাস্তা সংকুচিত হচ্ছে।
কেন কমছে চাকরির সুযোগ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কারণগুলির মধ্যে রয়েছে নিয়োগ খরচ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন।
ব্রিটিশ ব্যবসাগুলোর উপর জাতীয় বিমা অবদান বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরি বাড়ার কারণে কর্মী নিয়োগের খরচ বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নেওয়ার বদলে বিদ্যমান কর্মীদের দিয়েই কাজ চালানোর চেষ্টা করছে।
এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহারও নতুন নিয়োগের ধরন বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের কিছু কাজ, যেগুলি আগে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সুযোগ তৈরি করত, সেগুলির একটি অংশ এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে।
অ্যাডজুনার তথ্য বলেছে, চলতি বছরে শুধু গ্র্যাজুয়েট চাকরিই নয়, তরুণদের জন্য এন্ট্রি-লেভেল সুযোগও চাপের মুখে পড়েছে।
কোন ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ কমেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই। বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরিষেবা, নার্সিং, আতিথেয়তা, লজিস্টিকস ও গুদাম ব্যবস্থাপনা খাতে চাকরির বিজ্ঞাপন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে।
তবে সব ক্ষেত্রের ছবি এক নয়। কিছু খাতে এখনও নতুন কর্মীর চাহিদা রয়েছে। শিক্ষা, ভ্রমণ, নির্মাণ এবং কিছু উৎপাদন শিল্পে গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের সুযোগ তুলনামূলক ভাবে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাকরির বাজারে এখন শুধু ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ তরুণদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এক মিলিয়নের বেশি তরুণ কর্মহীন
ব্রিটেনের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে আর একটি তথ্য। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখের বেশি তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সামাজিক সমস্যাও তৈরি করছে। কারণ দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়া তরুণদের আত্মবিশ্বাস, আয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের সামনে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ানো। সরকার ইতিমধ্যে প্রযুক্তিগত শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসূচির উপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কর্মীর চাহিদা বাড়বে, সেই অনুযায়ী তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
‘ডিগ্রি থেকে চাকরি’ পথ বদলে যাচ্ছে
একসময় ব্রিটেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল ভালো চাকরির অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই সমীকরণ বদলাচ্ছে।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু একই হারে বাড়ছে না নতুন চাকরির সুযোগ। ফলে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, আর অনেক গ্র্যাজুয়েটকে পড়াশোনা শেষ করার পর দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, যদি তরুণদের জন্য দ্রুত নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা না যায়, তবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ দক্ষ কর্মশক্তির উপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরিয়ে কর্মজীবনের যে স্বপ্ন নিয়ে হাজার হাজার তরুণ এগিয়ে আসছেন, ব্রিটেনের বর্তমান চাকরির বাজার সেই স্বপ্নের সামনে এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।






