গবেষণা
বদলে যাচ্ছে আয়ারল্যান্ডের আবহাওয়া
- উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙছে বারবার
- সামনে আরও তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টির ঝুঁকি

সুযোগ নেই আয়ারল্যান্ডের উষ্ণতা বৃদ্ধিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রবণতা থেকে আলাদা করে দেখার।
আয়ারল্যান্ডকে দীর্ঘদিন ধরে চেনা হয়েছে নাতিশীতোষ্ণ, মেঘলা ও তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার দেশ হিসেবে। কিন্তু সেই পরিচিত আবহাওয়ার ছন্দ বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, একের পর এক উষ্ণতার রেকর্ড ভাঙছে, তাপপ্রবাহ দীর্ঘতর ও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে কখনো দীর্ঘ শুষ্ক সময়, আবার কখনো অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঘটনাও বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনা নয় বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন।
আয়ারল্যান্ডের আবহাওয়া অধিদপ্তর মেট এইরেয়ানের সর্বশেষ বার্ষিক জলবায়ু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক একটি তথ্য। ২০২২ থেকে ২০২৫, টানা চার বছরই আয়ারল্যান্ডের রেকর্ড চারটি উষ্ণতম বছর। ২০২৫ সালে দ্বীপ আয়ারল্যান্ডের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ছিল ১১.১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৬১-৯০ সময়ের দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ১.৫৯ ডিগ্রি এবং ১৯৯১-২০২০ সময়ের গড়ের চেয়ে ০.৯৭ ডিগ্রি বেশি। বছরটি ছিল রেকর্ডে দ্বিতীয় উষ্ণতম, যেখানে ২০২৩ সালের ১১.২১ ডিগ্রিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
শুধু বার্ষিক গড় নয়, ঋতুভিত্তিক পরিসংখ্যানও একই প্রবণতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ২০২৫ সালের বসন্ত ছিল আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বসন্ত। মার্চ-এপ্রিল-মে মিলিয়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ শতকের গড়ের চেয়ে প্রথমবারের মতো ২ ডিগ্রিরও বেশি। এর পর ২০২৫ সালের গ্রীষ্মও হয়ে ওঠে রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম। উষ্ণ রাতের সংখ্যা বৃদ্ধিও এই রেকর্ডে বড় ভূমিকা রেখেছে।
গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যানেও পরিবর্তনটি স্পষ্ট। সেন্ট্রাল স্ট্যাটিসটিকস অফিসের (সিএসও) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে আয়ারল্যান্ডের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ছিল ৯.২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৮৬ সালে তা নেমেছিল ৮.২০ ডিগ্রিতে। যা কিনা ১৯৬১ সালের পর সবচেয়ে ঠান্ডা বছর। বিপরীতে ২০২২ সালে গড় তাপমাত্রা ১০.৬১, ২০২৩ সালে ১০.৯৬ এবং ২০২৪ সালে ১০.৪৫ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। অর্থাৎ সাম্প্রতিক দশকে উষ্ণ বছরগুলো ক্রমেই ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সাল ছিল ১৯৬১ সালের পর তৃতীয় উষ্ণতম বছর।
এই প্রবণতা ২০২৬ সালেও থামেনি। বছরের বসন্ত ছিল রেকর্ডের তৃতীয় উষ্ণতম যেখানে গড় তাপমাত্রা ১০.১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ১৯৯১-২০২০ সাল পযর্ন্ত গড়ের চেয়ে ১.০২ ডিগ্রি বেশি। এবছরের মে মাসের শেষ দিকে একটি হিট ডোম আয়ারল্যান্ডে রেকর্ড-ভাঙা উষ্ণতা তৈরি করে। এরপর জুনেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০২৬ সালের জুনের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৫.৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের চেয়ে ১.৬৫ ডিগ্রি বেশি।
জুনের শেষ সপ্তাহের ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ ও ২৬ জুনে মেট এইরেয়ানের ২৫টি প্রধান আবহাওয়া স্টেশনের মধ্যে ৯টি স্টেশনে রাতের সর্বকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয় এবং ছয়টি স্টেশনে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। ওয়াক পার্ক, কাউন্টি কার্লো এবং ডাবলিনে ২০ ডিগ্রির বেশি রাতের তাপমাত্রা, যাকে ট্রপিক্যাল নাইট বলে রেকর্ড করা হয়। আয়ারল্যান্ডের মতো শীতল আবহাওয়ার দেশের জন্য এ ধরনের রাত অত্যন্ত বিরল।
জুলাইতেও তাপপ্রবাহের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্ব দেখা গেছে। মেট এইরেয়ানের হিসাবে, আয়ারল্যান্ডে হিট ওয়েভ বলতে টানা অন্তত পাঁচ দিন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি সর্বোচ্চ তাপমাত্রাকে বোঝায়। জুলাই ২০২৬-এ দেশের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ উষ্ণ ও শুষ্ক সময়ের সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির ওপরে ওঠে এবং কিছু এলাকায় ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য আইরিশ গণমাধ্যম আরটিই-এর প্রতিবেদনে মেট এইরেয়ানের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ওই সময়ে তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা অতিরিক্ত উ্ষ্ণ।
শুধু গরম নয়, বদলাচ্ছে বৃষ্টির ধরনও
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আয়ারল্যান্ডে কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের শরৎ ছিল ৮৫ বছরের রেকর্ডে চতুর্থ সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল। মৌসুমটির বৃষ্টিপাত ছিল ১৯৯১-২০২০ গড়ের ১৩৪ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে মেট এইরেয়ান জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ চার মাসে একাধিক ভারী বৃষ্টির ঘটনা এবং ব্যাপক নদী ও উপকূলীয় বন্যা দেখা যায়।
অন্যদিকে বছরের প্রথম আট মাসে তুলনামূলক শুষ্ক পরিস্থিতিও ছিল। ২০২৫ সালে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন স্টেশনে ৬৪টি স্বতন্ত্র শুষ্ক সময় শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ১৮টি ছিল তীব্র খরায় আক্রন্ত এবং ৪২টি ছিল দীর্ঘসময় ধরে শুষ্কতায় আক্রান্ত। অর্থাৎ ভবিষ্যতের আয়ারল্যান্ডে একদিকে দীর্ঘ শুষ্ক সময়, অন্যদিকে অল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টিপাত, দুই ধরনের চরম পরিস্থিতিই বাড়তে পারে।
সমুদ্রও উষ্ণ হচ্ছে
জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক সমুদ্রের তাপমাত্রা। ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের কাছে একটি মেরিন হিটওয়েভ তৈরি হয়। কিছু উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রিরও বেশি এবং উপকূলের বাইরে কিছু এলাকায় প্রায় ৪ ডিগ্রি বেশি ছিল। উষ্ণ সমুদ্র বায়ুমণ্ডলে বেশি জলীয়বাষ্প সরবরাহ করতে পারে, যা ভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় ভবিষ্যতে জলোচ্ছাস ও উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিও বাড়বে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
২০২৫ সালে ইপিএ প্রকাশিত উচ্চ-রেজল্যুশনের জলবায়ু পূর্বাভাসে আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। ৪ কিলোমিটার গ্রিডে তৈরি নতুন জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হিটওয়েভ বাড়বে, তুষার ও তুষারপাতের দিন কমবে, দীর্ঘ শুষ্ক সময় এবং ভারী বৃষ্টিপাত দুটিই বাড়বে।
ইপিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১-২০৬০ সময়কালে আয়ারল্যান্ডের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ১ থেকে ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক নিঃসরণ কোন পথে যায় তার ওপর নির্ভর করে।
কারণ কী, দায়ই বা কতটা?
আয়ারল্যান্ডের উষ্ণতা বৃদ্ধিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রবণতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ইপিএ বলছে, মানব কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১ ডিগ্রি বেড়েছে এবং আয়ারল্যান্ডের তাপমাত্রাও ১৯০০ সালের তুলনায় গড়ে প্রায় ০.৮ ডিগ্রি বেড়েছে।
তবে আয়ারল্যান্ড নিজেও সমস্যার বাইরে নয়। ২০২৪ সালে দেশটির গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২ শতাংশ কমে ৫৩.৮ মিলিয়ন টন কার্বণ ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়েছে। কিন্তু মাথাপিছু নিঃসরণ ২০২৩ সালে ছিল ১০.৪ টন। যা ইইউ এর জয়বায়ু পরিবর্তন লক্ষ্যমাত্রা ২০২৭ অনুযায়ী গড়ে ৬.৯ টনের তুলনায় অনেক বেশি। কৃষি খাত একাই ২০২৪ সালের জাতীয় নিঃসরণের প্রায় ৩৭.৯ শতাংশের জন্য দায়ী। পরিবহন খাতের নিঃসরণ ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ১২৯ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বর্তমান নীতিগুলো যথেষ্ট দ্রুত কার্যকর না হলে ২০৩০ সালের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো কঠিন হবে। ইপিএর ২০২৫ সালে প্রকাশিত পূর্বাভাস বলছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০৩০ সালে নিঃসরণ কমার সম্ভাবনা ৯ থেকে ২৩ শতাংশ, যেখানে জাতীয় লক্ষ্যই ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ অবস্থার চেয়ে লক্ষমাত্রার ব্যবধান ২-৩ গুন।
আয়ারল্যান্ড তাই এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। এটি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান বাস্তবতা। রেকর্ড উষ্ণ বছর, উষ্ণ রাত, তাপপ্রবাহ, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ, খরা এবং অতিবৃষ্টির পরিসংখ্যান একই বার্তা দিচ্ছে। মেট এইরেয়ানের ভাষায়, উষ্ণতার প্রবণতা খুবই স্পষ্ট। সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়, বদলে যাওয়া আবহাওয়ার সঙ্গে শহর, কৃষি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও উপকূলীয় অঞ্চলকে মানিয়ে নেওয়াও এখন সমান জরুরি।






