কোথায় কষ্ট ব্রিটিশদের? শুনতে পথে নামছেন বার্নহ্যাম

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
জীবনযাত্রার খরচ কমানো থেকে পণ্যের ‘লুকোনো দাম’ ঠেকানো: আগস্টজুড়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কথা শুনবেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী; সেই অভিজ্ঞতাই ঢুকবে তাঁর ১০ বছরের পরিকল্পনায়
লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে বসে আমলা-মন্ত্রীদের পরামর্শ নয়, এবার সরাসরি মানুষের কাছে গিয়ে জানতে চান সংসার চালাতে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লাগছে কোথায়? বাজারে কিংবা পরিষেবা নিতে গিয়ে কীভাবে ঠকছেন তারা? আর সরকারের কোন পদক্ষেপে পকেটে সত্যিকারের স্বস্তি ফিরতে পারে?
এই লক্ষ্যেই চলতি সপ্তাহ থেকে ব্রিটেনজুড়ে সফরে বের হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। আগস্ট মাসের বেশির ভাগ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভাষায়, এ সময় বার্নহ্যাম থাকবেন মূলত ‘শ্রোতার ভূমিকায়’। জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যদিনের আর্থিক চাপ এবং শহরগুলোর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকাকে কী ভাবে ফের প্রাণবন্ত করা যায়–সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মহলের কাছ থেকে সেই কথাই শুনতে চান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর '১০ ডাউনিং স্ট্রিট' এখনও সফরের পূর্ণাঙ্গ সূচি প্রকাশ করেনি। তবে শিল্পের পতনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এবং গত এক দশকে যেখানে লেবার পার্টির সমর্থন কমেছে, সেসব জায়গায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দক্ষিণ ওয়েলসের পোর্ট ট্যালবটও সম্ভাব্য গন্তব্যের তালিকায় রয়েছে। ব্রিটেনের বৃহত্তম ইস্পাত কারখানার অবস্থান সেখানে; ২০২৪ সালে কারখানাটির শেষ ব্লাস্ট ফার্নেস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলাকার কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছিল।
বার্নহ্যামের দপ্তরের বক্তব্যেই সফরটির রাজনৈতিক বার্তা সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র বলেছেন, ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতিতে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে দামের আড়ালে বাড়তি খরচ লুকিয়ে রাখা কিংবা ক্রেতাদের ঠকানো নিত্যদিনের জীবনেরই অংশ–মানুষকে সেটি মেনে নিতে হবে। বার্নহ্যাম সেই ধারণা মানতে নারাজ। তাই ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর নতুন কিছু ব্যবস্থা ধাপে ধাপে সামনে আনার প্রস্তুতি চলছে।
‘লুকোনো দাম’ বলতে কোনো পণ্য বা পরিষেবার শুরুতে এক দাম দেখিয়ে পরে অতিরিক্ত ফি কিংবা অন্য খরচ যোগ করার মতো ব্যবস্থাকেও বোঝানো হতে পারে। তবে ঠিক কোন কোন বাণিজ্যিক চর্চার বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ আসবে, তা এখনও ঘোষণা করেনি সরকার। ফলে সফরটিকে শুধু প্রচারাভিযান নয়, ভবিষ্যৎ নীতির জন্য জনমত সংগ্রহের পর্ব হিসেবেও তুলে ধরছে ডাউনিং স্ট্রিট।
এই সফরে ব্রিটেনের বিভিন্ন হাই স্ট্রিট বা শহরের প্রধান কেনাকাটার এলাকা পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্নও থাকবে। সরকার এরই মধ্যে সামাজিকভাবে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত কিছু ব্যবসা যেমন ভেপের দোকান–বর্তমানে যে কর-সুবিধা পায়, তা পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পাব, সামাজিক ক্লাব ও সরাসরি গানের অনুষ্ঠানস্থলকে বাড়তি করছাড় দেওয়া হয়েছে।
২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই বার্নহ্যাম জীবনযাত্রার ব্যয়কে তাঁর সরকারের প্রথম সারির ইস্যু করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার দিনই তিনি ব্রিটিশদের কিছুটা ‘শ্বাস নেওয়ার জায়গা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরে একের পর এক ব্যবস্থা ঘোষণা করেন।
প্রথমত, ১ অক্টোবর থেকে গৃহস্থালির বিদ্যুৎ বিলে মূল্য সংযোজন কর তুলে দেওয়া হবে। সরকারের হিসাবে, এতে একটি সাধারণ পরিবারের বছরে প্রায় ৪৫ পাউন্ড সাশ্রয় হতে পারে। চলতি অর্থবছরে এই ছাড়ের খরচ মেটাতে আগের সরকারের ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ডের ডিজিটাল পরিচয়পত্র কর্মসূচি বাতিল করার অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইংল্যান্ডে একবারের বাসযাত্রার সর্বোচ্চ ভাড়া বর্তমান ৩ পাউন্ড থেকে কমিয়ে ২ পাউন্ড করা হবে। নতুন সীমা কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে। এর জন্য সরকারের ব্যয় হবে ৫০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি।
তৃতীয়ত, পাব, সামাজিক ক্লাব ও সরাসরি গানের অনুষ্ঠানস্থলের ব্যবসায়িক কর ২০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা এসেছে। ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হলে প্রায় ৩২ হাজার প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে এবং একটি সাধারণ পাব বছরে আনুমানিক ১ হাজার ১০০ পাউন্ড সাশ্রয় করতে পারবে।
কিন্তু কয়েকটি করছাড় ও ভাড়া কমানোর ঘোষণাতেই সমস্যার শেষ হচ্ছে না। ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতে ব্রিটেনে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে উঁচুতে থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও মানুষের বড় উদ্বেগ। জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রকাশিত ইপসসের জরিপে ৩০ শতাংশ ব্রিটিশ অর্থনীতিকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন; ২২ শতাংশের উদ্বেগ সরাসরি মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দাম নিয়ে।
এই বাস্তবতাতেই বার্নহ্যামের দেশভ্রমণের আলাদা রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, আগস্টের এই জনসংযোগ থেকে পাওয়া মতামত তাঁর প্রতিশ্রুত দেশের ১০ বছরের পরিকল্পনা তৈরিতে কাজে লাগানো হবে। বার্নহ্যাম সেটিকে ‘আশা ফিরিয়ে আনার’ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের বহু দিনের সামাজিক পরিচর্যা সংকট মেটাতেও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন বার্নহ্যাম। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রথম দিন তিনি বলেছিলেন, প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন সরকার যে সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, দায়িত্ব ছাড়ার আগে সেটি না ছুঁয়ে যেতে চান না তিনি।
তবে বিরোধীরা বার্নহ্যামের এই দ্রুত ঘোষণার রাজনীতিতে মোটেই মুগ্ধ নয়। কনজারভেটিভরা প্রশ্ন তুলেছে, একের পর এক ছাড় ও নতুন প্রতিশ্রুতির টাকা সরকার কোথা থেকে আনবে। ছায়া অর্থমন্ত্রী মেল স্ট্রাইডের অভিযোগ, সরকার একদিকে হাই স্ট্রিট বাঁচানোর কথা বলছে, অন্যদিকে তার নিয়ন্ত্রণ ও নীতির চাপেই ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের উপনেত্রী ডেইজি কুপার আবার এই সফরকে প্রধানমন্ত্রীর ‘আত্মপ্রচারের সফর’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
রিফর্ম ইউকের অর্থনীতিবিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিকের দাবি, মানুষের বিল সত্যিই কমাতে চাইলে জ্বালানি বিলে পরিবেশসংক্রান্ত শুল্ক ও কর বাদ দিতে হবে এবং অক্টোবরের বাজেটে নতুন কর বাড়ানো হবে না–এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে কল্যাণভাতা খাতে ব্যয় কমানোর দাবিও তুলেছেন তিনি।
বার্নহ্যাম অবশ্য এখনই বড় কর সিদ্ধান্তের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না। এর আগে তিনি বলেছেন, কর নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে বাজেটে। তাঁর সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট সামনে রেখেই তাই একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, মানুষের পকেটে আরও টাকা রাখতে চাইলে সেই অর্থ সরকার ঠিক কোথা থেকে জোগাড় করবে?
তবু বার্নহ্যামের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলটি পরিষ্কার। ওয়েস্টমিনস্টার থেকে মানুষের কাছে নীতি পৌঁছে দেওয়ার আগে, মানুষের কাছ থেকেই সমস্যার ভাষা শুনতে চান তিনি।
বিদ্যুৎ-বিল ও বাসভাড়ায় প্রথম দফার ছাড়ের পর এবার তাঁর প্রশ্ন, ব্রিটিশদের দৈনন্দিন জীবনে আর কোথায় খরচের ফাঁদ, আর কোথায় সরকার হাত দিলে সত্যিই একটু ‘শ্বাস নেওয়ার জায়গা’ মিলবে?




