ইতালিতে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন
- সীমান্ত ও ট্রানজিট জোন ২৫ প্রদেশে সম্প্রসারণ

এই পরিবর্তন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার একটি পদক্ষেপ বলে অবিহিত করছে ইতালি সরকার।
ইতালিতে অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন এক ডিক্রির মাধ্যমে সীমান্ত ও ট্রানজিট জোনের আওতা বাড়িয়ে দেশের ২৫টি প্রদেশে দ্রুতগতির সীমান্তভিত্তিক আশ্রয়-প্রক্রিয়া পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখের ডিক্রিটি ১০ আগস্ট ইতালির সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। ডিক্রিটি মূলত একটি ২০১৯ সালের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্ধারণ করেছে।
কিন্তু কেন এই পরিবর্তন?
ইতালি সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিবাসন প্রবাহের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সমন্বয় করা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন মাইগ্রেশন এন্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট বাস্তবায়নের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিক্রিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেগুলেশন ২০২৪/১৩৪৮ -এর সীমান্তে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ার বিধান এবং ইতালির ১২ জুন ২০২৬-এর ডিক্রি-ল ১০০/২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সীমান্ত, বন্দর ও অন্যান্য নির্ধারিত এলাকায় আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন দ্রুততর সীমান্ত প্রক্রিয়ার আওতায় পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোন এলাকাগুলো এই ব্যবস্থার আওতায়? নতুন ডিক্রিতে শুধু নির্দিষ্ট স্থলসীমান্ত নয়, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ক্রসিং এবং ইতালির বিভিন্ন বন্দরের তালিকার সঙ্গে নতুন অঞ্চলগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সমুদ্র, আকাশ ও স্থলপথে অভিবাসীদের প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোও এই ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। এর পাশাপাশি দ্রুতগতির সীমান্ত প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ২৫টি প্রদেশে বিশেষ কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫টি প্রদেশ হলো আস্তি, বেলুনো, বেনেভেন্তো, বোলোনিয়া, ফেরারা, জেনোয়া, ইম্পেরিয়া, লা স্পেজিয়া, লাতিনা, লেক্কো, মানতুয়া, মিলান, মনজা-ব্রিয়াঞ্জা, পাদুয়া, পোর্দেনোনে, রেজ্জিও ক্যালাব্রিয়া, সাভোনা, সিয়েনা, ট্রেভিসো, উদিনে, ভারেসে, ভেনিস, ভেরোনা, ভিবো ভ্যালেনশিয়া, ও ভিসেনজা।
ভেনেতো অঞ্চলে বিশেষ গুরুত্ব নতুন তালিকায় ভেনেতো অঞ্চলের বেলুনো, পাদুয়া, ট্রেভিসো, ভেনিস, ভেরোনা ও ভিসেনজা রয়েছে। অর্থাৎ ভেনেতোর বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশই নতুন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। পাশাপাশি ফ্রিউলি-ভেনেজিয়া জুলিয়ার পোর্দেনোনে ও উদিনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ত্রিয়েস্তে ও গোরিজিয়া নতুন ডিক্রির মাধ্যমে প্রথমবার অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
২০১৯ সালের ডিক্রিতেই ওই দুই প্রদেশ সীমান্ত/ট্রানজিট জোন হিসেবে নির্ধারিত ছিল এবং নতুন ব্যবস্থা সেই কাঠামোকে বহাল রেখেছে আশ্রয় আবেদনকারীদের জন্য এর গুরুত্ব কী? নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্ধারিত সীমান্ত বা ট্রানজিট এলাকায় করা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন দ্রুতগতির প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, সীমান্তে বা নির্ধারিত ট্রানজিট জোনে থাকা কোনো ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন করলে তার আবেদন সাধারণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দ্রুত সীমান্ত প্রক্রিয়ার আওতায় পড়তে পারে।
আবেদন যাচাই শেষে তা গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসন/রিটার্ন প্রক্রিয়ার দিকে যেতে পারে । প্রাথমিক যাচাই চলাকালে এসব নির্ধারিত এলাকায় প্রবেশ করা বা সেখানে নিয়ে আসা ব্যক্তিকে আইনগতভাবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইতালীয় ভূখণ্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেননি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিধানটি মূলত সীমান্ত-প্রক্রিয়ার আইনি কাঠামোর অংশ; এর অর্থ এই নয় যে ওই ব্যক্তি বাস্তবে ইতালির ভৌগোলিক সীমানার বাইরে রয়েছেন।
প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা বাড়বে
ডিক্রির মাধ্যমে নির্ধারিত এলাকায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে আশ্রয় আবেদন দ্রুত পরীক্ষা করার জন্য আঞ্চলিক কমিশনের অতিরিক্ত ১৯টি শাখা প্রতিষ্ঠার বিধান করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের লক্ষ্য হলো—সীমান্তে আগত ব্যক্তিদের পরিচয় ও প্রাথমিক যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করা, আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দ্রুত প্রক্রিয়া ব্যবহার করা এবং যেসব আবেদন আইনগতভাবে সুরক্ষার মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া। প্রবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা নতুন ডিক্রির কারণে ইতালিতে বসবাসরত প্রত্যেক অভিবাসী বা বৈধভাবে বসবাসকারী ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ট্রানজিট জোন’-এর আওতায় পড়বেন—এমন নয়। ডিক্রিটি মূলত সীমান্ত ও নির্ধারিত এলাকায় আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করছে। তাই ভেনিস, ভেরোনা, পাদুয়া, ট্রেভিসো বা ভিসেনজায় বসবাসকারী বৈধ অভিবাসীদের জন্য এটি সাধারণ বসবাসের অনুমতি বা দৈনন্দিন চলাচলের ওপর সরাসরি নতুন নিষেধাজ্ঞা হিসেবে বোঝা ঠিক হবে না। বরং বিষয়টি মূলত সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ, যাচাই এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদনকারীদের দ্রুত প্রক্রিয়াকরণকে কেন্দ্র করে।
সরকারের উদ্দেশ্য বনাম মানবাধিকার প্রশ্ন
ইতালীয় সরকারের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার একটি পদক্ষেপ। অন্যদিকে, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দ্রুত প্রক্রিয়ার মধ্যেও প্রত্যেক আবেদনকারী যেন তার আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চাওয়ার অধিকার, আইনি সহায়তা এবং আপিলের সুযোগ যথাযথভাবে পান। নতুন ডিক্রিটি তাই শুধু প্রশাসনিক মানচিত্র পরিবর্তন নয়; ইতালিতে ভবিষ্যতে আশ্রয় আবেদন, সীমান্ত screening এবং প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার ওপরও এর বাস্তব প্রভাব পড়তে পারে।






