ফ্রান্সে বিক্ষোভের তৃতীয় ঢেউ
- রঙ মেখে সঙ সেজে পথে পথে বিক্ষোভকারীরা
- ক্লাউন, স্পাইডারম্যান, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বেশে বিক্ষোভে নেমেছেন শত শত মানুষ: আটক ২৯০ জন

ছবি: রয়টার্স
দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল অবস্থা, অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও বাজেট সংকোচনের চাপে ফুঁসে উঠেছে পুরো ফ্রান্স। জনমনে তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকা সে ক্ষোভ সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে সেপ্টেম্বরে। ছাত্র-জনতার সে বিক্ষোভে যোগ দেন ট্রেড ইউনিয়ন ও ‘ইয়ালো ভেস্ট’ বিক্ষোভকারীরাও। তখন ছিল শুরুর ঢেউ। এরপর অক্টোবরে আছড়ে পড়ে বিক্ষোভের দ্বিতীয় ঢেউ। কিছুদিন থেমে থাকার পর এবার বিক্ষোভের তৃতীয় ঢেউ দেখল ফ্রান্স।
দ্য টেলিগ্রাফের গত শনিবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বিক্ষোভ ছিল একটু ভিন্ন। এদিন প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীর মিছিল এগিয়ে চলার সময় তাদের সঙ্গে ছিল ক্লাউন, ডাইনি ও জলদস্যুরা। ফ্রান্সে রাস্তায় জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের মাথার ওপর পুরো সময় চক্কর দেয় পুলিশের হেলিকপ্টার। কালো মাস্ক পরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আরও ছিল স্পাইডারম্যান, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব এবং জম্বিরূপী মাইকেল জ্যাকসন। তাদের হাতে থাকা নানা প্ল্যাকার্ডে ছিল বিভিন্ন বার্তা। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলার জন্য টিয়ার গ্যাসের প্রয়োজন নেই।’ অন্যটিতে লেখা ছিল, ‘হ্যালোইনের জন্য ক্ষুব্ধ নাগরিকের বেশ ধরেছি।’ প্যারিসে আরও অনেকের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন জেরোম রদ্রিগেজ। তিনি বলেছেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, ফ্রান্সের অর্থনীতির অবস্থা খারাপই থাকবে। কারণ, বর্তমানে আমাদের দেশ চালাচ্ছেন একদল অযোগ্য মানুষ, যারা বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ নিয়ে খেলা করছেন অথচ সাধারণ পরিবারগুলো সামান্য কিছু পয়সার জন্য হিমশিম খাচ্ছে। আর ঠিক এ কারণেই আমরা এখানে এসেছি; আমাদের দাবিগুলো আরও জোরালো কণ্ঠে তুলে ধরার জন্য।’
দ্য গার্ডিয়ানের রবিবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স জুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর মুখোশধারী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুন্যেজ জানিয়েছেন, সারা দেশে পরিকল্পিত প্রায় ১৫০টি বিক্ষোভ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে; তবে সমাবেশগুলো শেষ হওয়ার পর্যায়ে কিছু দাঙ্গাকারীর পক্ষ থেকে পুলিশকে অত্যন্ত তীব্র পর্যায়ের সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্যারিসে এক পুলিশ সদস্য একটি মলোটভ ককটেলের আঘাতে আহত হয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন এবং এ ঘটনাকে ‘হত্যার প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি আরও বলেছেন, ‘আজ রাতে যারা সংঘাত চায়, তাদের মোকাবিলার জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’ নুন্যেজ এই বিক্ষোভে কিছু পক্ষ থেকে ‘অস্বাভাবিক’ মাত্রার সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করেন। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার জন্য তিনি দায়ী করেছেন কট্টর বামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে। হ্যালোইন আইন ভাঙার কোনো অজুহাত হতে পারে না বলেও সতর্ক করে বলেছেন নুন্যেজ। ‘পোর্ত দ্য শারঁতোঁ’ এবং এর আশপাশ এলাকায় কালো পোশাক পরিহিত এবং মুখোশধারী অনেক মানুষ হাতুড়ি দিয়ে রাস্তার পাথর উপড়ে ফেলে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারে বলে উল্লেখ করা হয় দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অন্তত একটি অগ্নিসংযোগকারী বস্তুও নিক্ষেপ করা হয়। জবাবে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। প্যারিস পুলিশের ভাষ্যমতে, ‘কয়েকশ দাঙ্গাবাজ বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছিল।’ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার ফ্রান্স জুড়ে আটক হয়েছেন ২৯০ জনেরও বেশি।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ১৭ অক্টোবর দেশটি সাক্ষী হয় বড় গণবিক্ষোভের। সে সময় ফ্রান্সের অনেক শহরে রাস্তায় সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেশটির জন্য এটি ছিল নাগরিক অস্থিরতার অন্যতম ভয়াবহ দিন। ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য স্থানেও হয়েছে বিক্ষোভ। জার্মানিতে, ‘জেন জেড রেগেল্ট!’ (‘জেন জেডই সব সামলে নেবে’) নামের একটি গোষ্ঠীর আয়োজিত তরুণ-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের শেষপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা আতশবাজি ও অন্যান্য বস্তু ছুড়তে শুরু করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে।



