যুক্তরাষ্ট্র-গ্রিনল্যান্ড-ডেনমার্কের চুক্তিতে কী আছে?

ড্রোনের মাধ্যমে ধারণ করা গ্রিনল্যান্ডের নুক শহরের একটি সামগ্রিক দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
অবশেষে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে জিতলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প! তার একক ইচ্ছায় ডেনমার্ক এবং উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপটিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করতেই হলো।
স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে সই হয় নিরাপত্তা চুক্তি। নিরাপত্তাবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় এ চুক্তি সই হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন চলাকালে। এর মাধ্যমে একপ্রকার অবসান হলো দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার।
এ দ্বীপে রয়েছে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর অষ্টম বৃহত্তম মজুদ। যেসব ধাতু ব্যবহৃত হয় মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটর তৈরিতে। এ ছাড়া লিথিয়াম ও কোবাল্টের মতো অন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাতুরও বিশাল মজুদ রয়েছে এখানে। আছে তেল ও গ্যাসও। তবে বর্তমানে পুরো দ্বীপ এলাকায় আছে মাত্র দুটি সক্রিয় খনি।
বিপুল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এজন্য প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করার কথাও জানান এ রিপাবলিকান। আবার দ্বীপটি কিনে নেওয়ার ইচ্ছার কথাও বলেছিলেন তিনি। এ নিয়ে ডেনমার্কসহ ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের মনোমালিন্য চলছিল এতদিন। তবে এ চুক্তির মাধ্যম আপাতত ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে দ্বীপটি নিয়ে বিরোধ কিছুটা মিটল।
চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ওপর ব্যাপক কর্তৃত্ব পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেনিশ সরকারের প্রকাশিত একটি নথির তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষাবিষয়ক ১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক চুক্তির পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও প্রতিবেদনেও চুক্তির কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যা তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য।
চুক্তির সামরিক দিক
চুক্তির মাধ্যমে মূলত সামরিকভাবে লাভবান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রই। দেশটি সেখানে আরও বেশি সামরিক উপস্থিতির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করল। এখন দ্বীপটিতে ওয়াশিংটন আরও দুটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে। এগুলো স্থাপন করা হবে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক ও পূর্ব উপকূলে মেস্টারসভিগে।
শুধু তাই নয় দ্বীপটিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঘাঁটি রয়েছে ‘পিটুফিক স্পেস বেস’, সেটিরও সম্প্রসারণও করা যাবে।
ঘাঁটি স্থাপনের পাশাপাশি দ্বীপের আকাশ ও জলপথেও অবাধ প্রবেশাধিকার পাবে ওয়াশিংটন। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌযানগুলো অধিকার পাবে গ্রিনল্যান্ডের আকাশসীমা ও জলসীমাসহ পুরো অঞ্চল ব্যবহারের।
চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সেনাসংখ্যা বা সময়সীমার উল্লেখ নেই।
ন্যাটোর সঙ্গে এ চুক্তির কী সম্পর্ক?
ন্যাটো একটি সামরিক সহযোগিতার জোট। মূলত ইউরোপের দেশগুলোই এ জোটের সদস্য। এর নেতৃত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জোটভুক্ত দেশগুলো পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ।
এ চুক্তিতে আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর শক্তিশালী উপস্থিতির প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ডেনমার্ক ওই অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড কখনো স্বাধীন হলেও এ জোট থেকে বের হওয়ার পথ রাখা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, যদি দ্বীপটি কখনো স্বাধীন হয়, তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে নিশ্চিত করতে হবে যে নতুন রাষ্ট্রটি যেন ন্যাটোর সদস্য হিসেবে থাকে। প্রয়োজনে সদস্যপদ পেতে করতে হবে আবেদন।
অন্যদিকে ন্যাটোর সদস্য নয় এমন কোনো দেশের গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি রাখার ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
গ্রিনল্যান্ডের কী কী অধিকার রয়েছে?
চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কথা বলা হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যাতে গ্রিনল্যান্ডের সমাজ ও জীবনযাত্রার প্রতি সম্মান বজায় থাকে।
চুক্তির অর্থনৈতিক দিক
গ্রিনল্যান্ডের খনি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা বিনিয়োগের বিষয়ে চুক্তিতে কিছু বলা হয়নি।
তবে চুক্তির ফলে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র, ন্যাটোর সহযোগী দেশ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো বিনিয়োগকারী গ্রিনল্যান্ডের সংবেদনশীল খাতগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
এ নিয়মগুলো কার্যকর করার লক্ষ্যে গ্রিনল্যান্ড বিনিয়োগের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করবে।
চুক্তির বর্তমান অবস্থা কী?
চুক্তি সই হলেও এটি এখনো কার্যকর হয়নি। কার্যকর হওয়ার আগে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পার্লামেন্টকে এটি অনুমোদন করতে হবে।
চুক্তিটির কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ নেই। এতে তখন কোনো পরিবর্তন আনা যাবে যখন সব পক্ষ সম্মত হবে।
সূত্র: রয়টার্স






