আইএসে যোগ দেওয়া ব্রিটিশ বাংলাদেশি নারী শারমিমা বেগম সিরিয়ায় গ্রেপ্তার

ছবি: রয়টার্স
পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন থেকে কিশোরী বয়সে সিরিয়ায় গিয়ে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসে যোগ দেওয়া ব্রিটিশ বাংলাদেশি নারী শারমিমা বেগমকে সিরিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মানির বার্লিনে চলতি বছরের একটি সন্ত্রাসী হামলার তদন্ত করতে গিয়ে হামলাকারীর সঙ্গে শারমিনার যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার পর পশ্চিমা গোয়েন্দাদের সহায়তায় তাকে সিরিয়ায় শনাক্ত করা হয়।
বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী শারমিমা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পূর্ব লন্ডনের বাড়ি ছেড়ে সিরিয়ায় চলে যান। তিনি বেথনাল গ্রিন একাডেমির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার যাওয়ার দুই মাস পর একই স্কুলের শামিমা বেগম, আমিরা আবাসে ও কাদিজা সুলতানাও সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয়। শারমিনা ও শামিমার মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
শারমিমাকে খুঁজে পাওয়ার সূত্র আসে জার্মান পুলিশের একটি সন্ত্রাসী হামলার তদন্ত থেকে। গত ২৫ জুলাই বার্লিনের প্রাইড উৎসবের কাছে একটি ভ্যান জনতার ওপর তুলে দেওয়ার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে এক নারী নিহত এবং ২৯ জন আহত হন।
জার্মান কর্তৃপক্ষ হামলাকারীকে ২১ বছর বয়সী আবদুল বলাউট হিসেবে শনাক্ত করে। প্রায় ২৪ ঘণ্টার অভিযানের পর পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থায় তিনি নিহত হন। জার্মান কর্তৃপক্ষ জানায়, ঘটনাটিকে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। বলাউট এর আগে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জার্মান প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন।
ডেইলি মেইলের দাবি, হামলার আগে শারমিমার সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন বলাউট। আইএসের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়া নিজের একটি ভিডিও তিনি শারমিমাকে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হামলার পর ভিডিওটি আইএসের প্রচার বিভাগের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল।
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে শারমিমা সরাসরি বার্লিন হামলার পরিকল্পনা বা বাস্তবায়নে অংশ নিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মানির কেন্দ্রীয় অপরাধ তদন্ত সংস্থা শারমিমার ব্যবহৃত ফোন নম্বর একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাকে দেয়। পরে সেই সূত্র ধরে সিরিয়ার একটি গোপন আস্তানায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শারমিমার বাবা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, তিনি এতদিন ধারণা করেছিলেন তার মেয়ে সিরিয়ায় মারা গেছে। মেয়ের বেঁচে থাকার খবর জেনে স্বস্তি পেলেও গ্রেপ্তারের বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার বা পুলিশের কাছ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
ডেইলি মেইল আরও জানিয়েছে, কয়েক বছর আগেই শারমিমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। এখন সিরিয়ায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধে বিচার হতে পারে। তবে তার বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বার্লিন হামলার তদন্তে প্রয়োজন হলে জার্মান কর্তৃপক্ষও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা হস্তান্তরের উদ্যোগ নিতে পারে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল শারমিনার সিরিয়া যাত্রা
শারমিমার নাম প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। এর আগে ক্যানসারে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল। পারিবারিক জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি উগ্রবাদী প্রচারণার সংস্পর্শে এসেছিলেন বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ব্রিটিশ আদালতের নথিতেও পরে উঠে আসে যে, ২০১৪ সালে শারমিনা এমন একজন ব্রিটিশ নারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুসরণ করছিলেন, যিনি আগে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দিয়ে অন্যদেরও সেখানে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। শারমিমা একই সঙ্গে শামিমা, আমিরা ও কাদিজার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শারমিমা গ্যাটউইক বিমানবন্দর থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যান এবং পরে সীমান্ত পেরিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেন।
এর ঠিক দুই মাস পর, ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৫ বছর বয়সী শামিমা বেগম ও আমিরা আবাসে এবং ১৬ বছর বয়সী কাদিজা সুলতানা গ্যাটউইক থেকে ইস্তাম্বুলে যায়। সেখান থেকে তারা সিরিয়ায় প্রবেশ করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল আগে চলে যাওয়া বন্ধু শারমিনার সঙ্গে যোগ দেওয়া।
পরবর্তীতে কাদিজা সুলতানা সিরিয়ায় নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায় এবং আমিরা আবাসেকেও নিহত বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে ২০১৯ সালে শামিমা বেগমকে সিরিয়ার একটি শিবিরে খুঁজে পাওয়া যায়। তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পরে বাতিল করা হয় এবং দেশে ফেরার অধিকার নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন।
এক দশকেরও বেশি সময় পর শারমিমার গ্রেপ্তারের খবরে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন থেকে চার স্কুলছাত্রীর সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেওয়ার সেই আলোচিত ঘটনা আবারও সামনে এসেছে।



