চীনের রোবট কারখানায় কাজ করতে পারবে?

বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব রোবট সম্মেলনে ইউনিট্রি নির্মিত হিউম্যানয়েড রোবটগুলো একটি দলীয় নৃত্য প্রদর্শন করছে। ছবি: রয়টার্স
চীনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক হিউম্যানয়েড রোবট। সেখানে হেডসেট পরে রোবটগুলোকে নানা কাজ শেখাচ্ছেন একদল প্রশিক্ষক। কেউ নুডলস প্যাকেট করছেন, কেউ আবার চেষ্টা করছেন কফি বানানোর।
তবে কাজগুলো এখনো খুব ধীরগতির। রোবটগুলো অনেকটাই অদক্ষ। এই প্রজন্মের রোবটগুলো শিল্প-কারখানায় কাজেরও উপযোগী নয়। প্রশিক্ষণকেন্দ্রে একজন নতুন প্রশিক্ষক ৩০০ বার চেষ্টা করে হয়তো একটি কার্যকর নড়াচড়া করাতে পারেন। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৫০-এ।
চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবটেক গত বছরের অক্টোবরে গুয়াংশি আঞ্চলিক সরকারের কাছ থেকে একটি কাজ পায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। এর আওতায় প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির জন্য হিউম্যানয়েড রোবট ও প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সরবরাহ করা হয়।
উদ্দেশ্য হলো বাস্তব জগতে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রশিক্ষণ তথ্য তৈরি করা। প্রশিক্ষকেরা হেডসেটের মাধ্যমে রোবটের চোখ থেকে দেখতে পারেন। হাতে থাকা সেন্সরযুক্ত নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে নিজেদের নড়াচড়া করে রোবটের কাজে রূপান্তর করেন।
দক্ষিণ চীনের গুয়াংশি চুয়াং অঞ্চলের লিউঝৌয়ের ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি ভর্তুকিনির্ভর এই প্রকল্পের এখনো লাভজনক হওয়ার পথ নেই। পরিচালন ব্যয় বেশি। অন্যদিকে নতুন এই বাজারে রোবট প্রশিক্ষণের তথ্যের দামও কম।
চীনের সামনে একটি বড় বাস্তবতা হলো জনসংখ্যার পরিবর্তন। দেশটির জনসংখ্যা বয়স্ক ও সংকুচিত হচ্ছে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ছে শিল্প খাতের অন্যতম বড় শক্তি বিপুল শ্রমিকের জোগান।
সেই ঘাটতি পূরণে হিউম্যানয়েড রোবটকে ভবিষ্যতের সমাধান হিসেবে দেখছে চীন। পাশাপাশি দেশটির সামরিক গবেষকেরাও কাজ করছেন ভবিষ্যৎ অস্ত্র ব্যবস্থায় রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে।
কিন্তু সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর রোবটের বর্তমান সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। চীনের রোবট নির্মাতারা উন্নত হার্ডওয়্যার তৈরি করতে পারলেও সাধারণ কাজ করার মতো বুদ্ধিমত্তা এখনো রোবটগুলোর নেই। বিশেষ করে পূর্বনির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হলে তারা সমস্যায় পড়ে।
ইউয়ানলি লিংজির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তাং ওয়েনবিন মার্চে এক শিল্প সম্মেলনে রোবটগুলোর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য, অনেক সময় যে কাজকে আমরা রোবটের কাজ হিসেবে দেখছি, তা আসলে নাচের মতো পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনী।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চীনে রোবট উৎপাদনের সক্ষমতা এখন বাণিজ্যিক চাহিদার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে রোবটের দামও কমছে।
গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ হাজার হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ হয়েছে। এর ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছর দেশটি এক লাখের বেশি হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির আশা করছে।
আর বোফা গ্লোবাল রিসার্চের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালে বিশ্বে বছরে হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের সংখ্যা ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে।
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পে সরকারি অর্থের ভূমিকা অনেক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারগুলো হিউম্যানয়েড রোবট ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কিনতে অন্তত ২৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল মাত্র ৬০ লাখ ডলার।
চীনে এখন ১৫০টির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট কোম্পানি রয়েছে। সংখ্যাটি দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্র্যান্ডের সংখ্যার চেয়েও বেশি।
সরকার শুধু অর্থ দিচ্ছে না, বাজারও তৈরি করছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গত জুনে ১০টি প্রদেশকে হিউম্যানয়েড ও এআই ব্যবস্থার বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য অন্তত ২০টি করে জায়গা চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান স্টেট গ্রিডও এ খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি এআই চালিত হিউম্যানয়েড দুই হাতের রোবট ও রোবট কুকুরের পেছনে ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি রোবট বছরে ৭৪ হাজার থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার ডলার শ্রম ব্যয় কমাতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণও কমবে।
তবে হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্যানেল শিল্প যখন চীন বড় আকারে উৎপাদন বাড়ায়, তখন সেগুলো ছিল তুলনামূলক পরিণত প্রযুক্তি। হিউম্যানয়েড রোবট এখনো রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ও খরচ নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই গেছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মানুষের মতো দেখতে সাধারণ কাজের রোবট আদৌ অর্থনৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক, সেটিও ভাবার বিষয়।
চীনের রোবট খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী ইতিমধ্যে এটিকে বাবল বা অতিমূল্যায়িত বাজার হিসেবে দেখছেন।
তাদের ধারণা, ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালে এই খাতে বড় ধরনের একীভূতকরণ শুরু হতে পারে। অর্থাৎ অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে না পেরে বাজার থেকে সরে যেতে পারে।
ইউনিট্রি ও ইউবটেককে সম্ভাব্য টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধরা হচ্ছে। গত ১৯ আগস্ট সাংহাইয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রথম দিন ইউনিট্রির শেয়ারের দাম পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে যায়। একপর্যায়ে কোম্পানিটির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার। পরে অবশ্য শেয়ারের দাম কমে আসে।
কারখানায় কি সত্যিই মানুষের বিকল্প হবে
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে একের পর এক সাফল্যের খবর সামনে এলেও কারখানার বাস্তব কাজে পুরোপুরি উপযোগী হবে না। বর্তমানে রোবট নিয়ে চীনে যত প্রদর্শনী হচ্ছে, কারখানায় তাদের ব্যবহার সে তুলনায় একেবারে সীমিত।
টেলিভিশনে নাচছে রোবট। বক্সিং করছে। নানা কসরত দেখাচ্ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, এসব রোবট তাদের খরচের তুলনায় যথেষ্ট মূল্য তৈরি করতে পারবে কি না।
চীনের গাড়ি শিল্পে এর একটি বাস্তব উদাহরণ আছে। কারখানার উৎপাদন লাইনে ইতিমধ্যে রয়েছে শিল্প রোবটের আধিপত্য। সেগুলো হিউম্যানয়েডের তুলনায় দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ।
বেইজিংয়ে শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় ৯১ শতাংশ উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। শুধু গাড়ির বডি তৈরির অংশেই ৭০০টির বেশি শিল্প রোবট রয়েছে। তারা স্পট ওয়েল্ডিং, রিভেটিং ও আঠা লাগানোর মতো কাজ করছে।
শাওমি অবশ্য বাদ দেয়নি হিউম্যানয়েডকেও। প্রতিষ্ঠানটি নাট লাগানোর মতো কাজের জন্য রোবট প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে গিলির জিকার ব্র্যান্ডও ইউবটেকের সঙ্গে হিউম্যানয়েড দিয়ে বিভিন্ন কাজ পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়েছে। কিন্তু এখনো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কাজগুলো করছে রোবটিক বাহু ও স্বয়ংক্রিয় যান।
তবে হিউম্যানয়েড রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের মতো নয়। ডিপসিক বা কিমির মতো চ্যাটবট বিপুল পরিমাণ লেখা বিশ্লেষণ করে। কিন্তু কারখানার একটি রোবটকে দেখতে হয়। বুঝতে হয়। এরপর সেই অনুযায়ী শরীর নড়াতে হয়।
একটি কাপড় কীভাবে ধরবে, স্ক্রুতে কতটা চাপ দেবে কিংবা কোনো বস্তু কোন কোণ থেকে তুলবে, এসব সিদ্ধান্ত তাকে বাস্তব জগতের তথ্য থেকে নিতে হয়।
এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন মডেল। এগুলো প্রশিক্ষণ দেওয়া অনেক কঠিন। কারণ বাস্তব জগতের হাজার হাজার ঘণ্টার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
একটি রোবট কোনো একটি ওয়ার্কস্টেশনে কাজ শিখে নিলেও জায়গা বদলালে সমস্যা হতে পারে। বস্তু বদলে গেলে, আলো বদলালে, কোণ বা পৃষ্ঠের ধরন পাল্টালে কিংবা যন্ত্রপাতিতে পরিবর্তন এলে একই কাজ রোবট আর ঠিকভাবে করতে পারে না।
বেইজিং ইনস্টিটিউট ফর জেনারেল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গবেষক জিয়া বাওশিয়ংয়ের ভাষায়, সমস্যাটি শেষ ১০ সেন্টিমিটার থেকে শেষ ১ সেন্টিমিটার, এমনকি ১ মিলিমিটার পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়।
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট শিল্প এখন বড় এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। বিনিয়োগ বাড়ছে। সরকারি সহায়তাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তব বাজার এখনো সেই গতিতে তৈরি হয়নি।
লিউঝৌ প্রশিক্ষণকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, একটি রোবটকে ক্রেট বহনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
‘সাধারণ কাজেও রোবটগুলো মানুষের মাত্র ২০ শতাংশ গতিতে বা উৎপাদনক্ষমতায় কাজ করতে পারে’, সেখানকার এক কর্মীর ভাষ্য।
তবে ওই কর্মীর ধারণা, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে তারা মানুষের সঙ্গে ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স













