১ কোটি ৯২ লাখ আফগান তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন: ইউনিসেফ

ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তানে আসন্ন শীতে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির সেপ্টেম্বরের মানবিক পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে অর্থায়নের ঘাটতির কারণে অপুষ্টির চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ ও জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের এই পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। এর আগে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ১ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ সংকটাপন্ন বা এর চেয়েও খারাপ মাত্রার খাদ্যসংকটে ছিল। খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩৪ লাখ মানুষ ছিল জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থাটি বলেছে, বৃষ্টিপাত ও কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে সামগ্রিকভাবে মানবিক সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ। তাদের মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ শিশু।
শিশুদের মধ্যে ‘ওয়েস্টিং’ বা উচ্চতার তুলনায় ওজন কমে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক অপুষ্টির হার ২০২৬ সালের শুরুর তুলনায় দেশটির ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ২৯টিতে বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩টি প্রদেশে তীব্র অপুষ্টির হার ২০২৫ সালের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোয় পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে এবং অপুষ্টির চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগস্ট থেকে অক্টোবর— এই সময়ে অপুষ্টির হার রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার শিশুর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফ ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো প্রায় ১৩ লাখ শিশুর অপুষ্টি শনাক্তে পরীক্ষা চালায়। চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় ১ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ শিশুকে। তাদের মধ্যে ৬০ হাজার ৬০৮ জন ছিল গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত এবং ৪৬ হাজার ৭৮৮ জন ছিল উচ্চঝুঁকিতে থাকা মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত।
দেশটির ৩ হাজার ৫০০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ১৫ হাজার কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে পুষ্টিসেবা দিয়েছে সংস্থাটি। প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার শিশুর পরিচর্যাকারীকে পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীকে একাধিক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ সম্পূরক খাবার দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষ ধরনের পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে হুমকি তৈরি করেছে।
সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রম সমন্বয়কারী ‘নিউট্রিশন ক্লাস্টার’ জানিয়েছে, চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রস্তুত খাবারের ২ লাখ ১০ হাজার কার্টনের ঘাটতি রয়েছে। এটি বার্ষিক চাহিদার ১৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের বাকি সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুত সম্পূরক খাবারেরও ৬৫ শতাংশের সমপরিমাণ ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ কোটি ১ লাখ ডলার সংগ্রহ করতে পারলেও নিউট্রিশন ক্লাস্টারের কার্যক্রমে অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে ৫৬ শতাংশ।
ইউনিসেফের নিজস্ব ৯৪ কোটি ৯১ লাখ ডলারের মানবিক সহায়তার আবেদনও গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪৮ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে। ফলে প্রায় ৪৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়ে গেছে। সংস্থাটির পুষ্টি কর্মসূচিতে অর্থায়নের ঘাটতি ৭০ শতাংশ। আর পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচিতে এই ঘাটতি ৮৪ শতাংশ।
আফগানিস্তানের জন্য নেওয়া সামগ্রিক ১৭১ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার ৬৭ শতাংশ অর্থায়নই সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ নিশ্চিত হয়নি। ইউনিসেফ বলেছে, অর্থের অভাবে সহায়তার আওতা কমছে এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি ও সুরক্ষাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের ফিরে আসাও আগে থেকেই চাপে থাকা সেবাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবরের মধ্যে পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ১৩ লাখ আফগান দেশে ফিরেছে। তাদের মধ্যে পাকিস্তান থেকে ফিরেছে প্রায় ৭ লাখ ১৫ হাজার ৪০০ জন এবং ইরান থেকে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ জন।
ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬০ জনকে মূলত ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দেশে ফিরে আসা পরিবারগুলো পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাব, জীবিকা অর্জনের সীমিত সুযোগ এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি ও সুরক্ষাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়ছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবও তাদের নতুন করে জীবন গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।
সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে আসা ২৩ হাজার ৪০৮ শিশুর অপুষ্টি শনাক্তে পরীক্ষা চালায় সংস্থাটি। চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয় ৭৮৭ শিশুকে।
রোগের প্রাদুর্ভাবও মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আফগানিস্তানে বন্য পোলিও ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৩৫টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে শনাক্ত হয়েছে ২১টি।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১২টি প্রদেশের ৩১টি জেলায় এসব সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে ২০টি এবং পূর্বাঞ্চলে ১৩টি ঘটনা ঘটেছে। পরিবেশগত নজরদারিতেও ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৯১টি নমুনায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোলিওতে আক্রান্ত শিশুদের ৩৬ শতাংশই নিয়মিত কর্মসূচির আওতায় এক ডোজও মুখে খাওয়ার পোলিও টিকা পায়নি।
ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, দেশটিতে তীব্র জলীয় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সীমিত সচেতনতাকে রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
ফিরে আসা ও বাস্তুচ্যুত শিশুরাও শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের সংকট।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি ও এর সহযোগীরা নানগারহার প্রদেশে ২০০টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে ৫ হাজার ৬১ শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৩৫১ জন মেয়ে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫৩৮টি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ৪৪ হাজার ১৩৮ শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রায় অর্ধেকই মেয়ে।
সংস্থাটি বলেছে, মানুষের অব্যাহত স্থানান্তর, স্কুলের সীমিত অবকাঠামো এবং প্রত্যন্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় পৌঁছানোর সমস্যা এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুধা, রোগ, বাস্তুচ্যুতি ও বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মিলিত চাপে রয়েছে আফগানিস্তান। আর অর্থায়নের ঘাটতির কারণে পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সেবার পরিধি সীমিত হয়ে পড়ছে।
সূত্র: আমু টিভি




