দাবানলের ধোঁয়ায় এক মাসে ৩৫৬০ মৃত্যু, ইন্দোনেশিয়ায় কেন এত প্রাণহানি

ছবি: রয়টার্স
ইন্দোনেশিয়ার দাবানলের ধোঁয়ায় শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই আনুমানিক ৩ হাজার ৫৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আগস্ট মাসের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণ।
সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় বায়ুদূষণের কারণে মোট ৫ হাজার ৩১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী দাবানলের ধোঁয়া।
প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দেশটিতে আগস্টে বায়ুদূষণে আনুমানিক ৩ হাজার ৭৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সে হিসাবে সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৪২ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৭৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে শহর ও শিল্পাঞ্চলের দূষণের কারণে।
হেলসিংকিভিত্তিক গবেষণা-প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (ক্রিয়া) এ হিসাব করেছে। সূক্ষ্ম বস্তুকণা দূষণ বা পিএম২.৫-এর স্বল্পমেয়াদি সংস্পর্শে আসার পরবর্তী দিনগুলোতে মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪ হাজার ৬১০ থেকে ৬ হাজার ৮০-এর মধ্যে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংখ্যা আনুমানিক হিসাব, নথিভুক্ত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নয়।
এক বিবৃতিতে বৃহস্পতিবার ক্রিয়া বলেছে, ‘ইন্দোনেশিয়ায় বন ও ভূমিতে আগুন লাগার কারণে বায়ুর মানের অবনতি হয়েছে। এতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৫৬০ হয়েছে, যা আগস্টের হিসাবের দ্বিগুণ।’
ক্রিয়ার হিসাবে, সেপ্টেম্বরে রেকর্ড ৫ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর থেকে বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ বায়ুতে শ্বাস নিয়েছেন। আগস্টে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ১৩ লাখ মানুষের এমন বায়ুতে শ্বাস নেওয়ার হিসাব পাওয়া গিয়েছিল। সে তুলনায় সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
বোর্নিও দ্বীপের ইন্দোনেশীয় অংশ কালিমানতানে মাসের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতে বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ২৮ লাখ, সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪ লাখে।
ক্রিয়ার হিসাবে, আগুনের ধোঁয়ার কারণে কালিমানতানের চারটি প্রদেশে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশ ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে সুমাত্রার কয়েকটি প্রদেশেও এ ধোঁয়ার কারণে ৮০ শতাংশের বেশি মৃত্যু হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে কালিমানতান মধ্যাঞ্চলে মৃত্যুহার ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ জন মারা গেছেন। এ হার আগস্টের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ জাভায় বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর ৭৩ থেকে ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল দাবানল ছাড়া অন্য উৎস। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প-কারখানা, যানবাহনের ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানো। সেপ্টেম্বরে এসব কারণে দ্বীপটিতে ১ হাজার ৫৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দাবানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর বায়ুদূষণের মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে ছিল।
সেপ্টেম্বরে কালিমানতান মধ্যাঞ্চলের পালাংকারায় প্রতিদিন বাতাসে পিএম২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৭২ মাইক্রোগ্রাম। পশ্চিম কালিমানতানের পন্টিয়ানাকে ছিল ৩২৭ মাইক্রোগ্রাম। ইন্দোনেশিয়ায় ৩০০ মাইক্রোগ্রামকে বিপজ্জনক মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার সীমা ১৫ মাইক্রোগ্রামের চেয়ে ২২ থেকে ২৫ গুণ বেশি।
২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে ভয়াবহ ধোঁয়াশা সংকট দেখা দিয়েছিল। এবারের দাবানল সেই সময়ের চেয়েও তীব্র।
ক্রিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে কালিমানতান, সুলাওয়েসি ও পাপুয়ায় আগুনের তীব্রতা নিয়ে উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য ২০১৫ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, ১৯ অক্টোবর টানা ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৪ হেক্টর জমিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
ধোঁয়াশার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বহু মানুষ। ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি প্রদেশে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭০ জন তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। ১৩ অক্টোবর এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০। জুলাই ও আগস্টে আক্রান্ত ৫০ হাজার ৮৯১ জনের তুলনায় বর্তমান সংখ্যা ছয় গুণেরও বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ৭৫ হাজার ১৭২ জন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
নিজেদের পদক্ষেপের পক্ষে বুধবার অবস্থান তুলে ধরেছে ইন্দোনেশিয়ার সরকার। তারা জানিয়েছে, কৃত্রিম বৃষ্টি সৃষ্টি ও আগুন নেভানোর কাজে ৭২ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ২ হাজার ১০০-এর বেশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে কাজে লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি বিতরণ করা হয়েছে ৫৩ লাখ মাস্ক।
ক্রিয়া জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার বাজেট ৭৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগে ২ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ বরাদ্দ থাকলেও তা কমিয়ে ৪৯১ বিলিয়ন রুপিয়াহ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
সংসদ সদস্য, পরিবেশবাদী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকারীদের আহ্বান সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এখনো দাবানলকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কর্মকর্তাদের যুক্তি, স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি’ এবং মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন টাস্কফোর্স কাজ করছে।
ক্রিয়ার মতে, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশার জন্য ইন্দোনেশিয়াকে দায়ী করা হতে পারে। এতে দেশটির পাম তেল এবং পাল্প ও কাগজ রপ্তানির ওপর আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক দায়ভার কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগারের ওপর পড়বে। বর্তমানে সীমিত বাজেট নিয়ে প্রদেশগুলোই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।
সংস্থাটি বলেছে, আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেষ্টার পরিবর্তে সরকারের উচিত পিটভূমি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেওয়া। এসব জলাভূমি থেকে পানি নিষ্কাশন করায় সেগুলো এখন আগুন লাগার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বন উজাড় পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নুসান্তারা অ্যাটলাসের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক ও বাগানশ্রমিকেরা জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় দাবানলের সূত্রপাত হয়। খরা ও এল নিনো আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি আগুনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ১৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে গেছে। আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও পূর্ব তিমুরেও।
ধোঁয়াশার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। গত শনিবার সিঙ্গাপুরে গ্যাস রপ্তানি কমিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। অন্যদিকে, দাবানলের জন্য দায়ী বলে মনে করা ইন্দোনেশীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনি নোটিস পাঠিয়েছে সিঙ্গাপুর।
সূত্র : দ্য ইনডিপেনডেন্ট





