আগামীর সময়

যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

নেপালের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়ে ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বালেন্দ্র শাহ। আজ শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুরে রাষ্ট্রপতি ভবনে বালেন্দ্র শাহকে শপথ পড়ান দেশটির রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল।

দেশটির অন্য রাজনীতিবিদদের থেকে কিছুটা আলাদা প্রকৃতির ছিলেন বালেন্দ্র শাহ। বলা যায়— এক ধরনের বিদ্রোহী—ভিন্নধর্মী ও রূঢ় প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতায় এসে কেমনভাবে দেশ চালাবেন বালেন্দ্র?

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বালেন্দ্রকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে তা উঠে এসেছে  আল-জাজিরায় প্রকাশিত সামিক খারেলের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।

দেশটির রাজতন্ত্রের অবসানের পর গত ১৮ বছরে নেপাল-এ ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকার পরিবর্তন হয়েছে প্রায় প্রতি বছরই—কেউ ক্ষমতায় আসার পর তাকে সরানো হয়েছে, আবার কয়েক বছর পর অনেকে সরে গেছেন নিজেই।

কয়েক মাস আগে জেনজিদের নেতৃত্বাধীন এক গণআন্দোলনে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ভোটাররা ব্যাপকভাবে সমর্থন দেন র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বালেন্দ্র শাহ এবং তার দল রাষ্ট্ৰিয় স্বাধীনতা পার্টিকে (আরএসএপ)। এর মাধ্যমে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ বিপুল ভোটে জয়ী হন বালেন্দ্র শাহ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বালেন্দ্র শাহ।

মাত্র চার বছর আগে গঠিত এই দলটির আগে বড় কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। শাহ নিজেও আগে শুধু কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন।

বিশ্লেষক ও ভোটাররা বলছেন—শাহ এবং তার দল এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে—২০২৫ সালের গণআন্দোলনের পর তরুণদের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার। তবে এই সুযোগের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে।

‘এই বিশাল জনসমর্থন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ তার দল সম্ভবত দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তবে প্রত্যাশা এত বেশি যে, সব পূরণ করা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে’—বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিষ্ণু সাপকোটা।

বড় জনসমর্থনই কি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে?

নির্বাচনে কেপি শর্মা ওলিকে তার দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতেই পরাজিত করেন বালেন শাহ। তার দল ১৬৫টি সরাসরি আসনের মধ্যে ১২৫টি জিতেছে। অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ১১০টি আসনের ফল এখনো বাকি, তবে সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্ৰিয় স্বাধীনতা পার্টি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। এটি এমন একটি বড় জনসমর্থন, যা রাষ্ট্ৰিয় স্বাধীনতা পার্টি (আরএসপি) নিজেরাও আশা করেনি।

‘আমরা ৫০ শতাংশের কিছু বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা আশা করেছিলাম, কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট আমাদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল’— বলছিলেন আরএসপির নেতা শিশির খানাল। বিদায়ী সংসদের একজন সদস্য ছিলেন। ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে আবার জয় লাভ করেন শিশির।

‘সমস্যা হলো, এত বড় ম্যান্ডেট মানুষের মধ্যে খুব উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করে, তারা দ্রুত ফলাফল চায়। কিন্তু নেপালের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং প্রায় স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সেই ফল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে—মনে করেন আরএসপি নেতা শিশির।

শাহের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হবে কার্কি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। এই কমিশনটি গঠন করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত বছর কেপি শর্মা ওলি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব নেন এই সরকারের প্রধান সুশিলা কার্কি।

এই কমিশনের কাজ ছিল— গত বছরের জেনজি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি তদন্ত করা। কমিশনটি ২০২৬ সালের ৮ মার্চ সরকারকে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। আশা করা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এই তদন্তের দায়িত্ব নতুন শাহ সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে, যাতে তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারে।

বিশ্লেষক বিষ্ণু সাপকোটা মনে করেন, ‘জনগণের মধ্যে জোরালো দাবি আছে যে এই প্রতিবেদন দ্রুত প্রকাশ করা হোক এবং বাস্তবায়ন করা হোক। যদি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিবেদন হস্তান্তর করে, তবে বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে করতে হবে। আর তিনি যখনই এটি শুরু করবেন, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসবে—যা তাকে খুব সতর্কভাবে সামাল দিতে হবে’।

গত বছরের আন্দোলনগুলো দুর্নীতি, খারাপ শাসনব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে জনরোষ থেকে শুরু হয়েছিল। ভোটাররা আশা করছে নতুন সরকার দ্রুত এই সমস্যাগুলোর সমাধান করবে। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির তদন্ত—বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে—নতুন সরকারের প্রথম বড় কাজগুলোর একটি হতে পারে। তবে এটি মোটেও সহজ চ্যালেঞ্জ নয়।

শাহ নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে রাষ্ট্ৰিয় স্বাধীনতা পার্টি-এ যোগ দেন এবং তাকে দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করা হয়। অন্যদিকে, দলটির প্রতিষ্ঠাতা, টেলিভিশন উপস্থাপক থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা রবি লামিছানে এখনো দলের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন।

লামিছানে নিজেও একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। তিনি আগে কারাভোগও করেছেন এবং বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। এছাড়া, তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও নেপালের—দুটি পাসপোর্ট অবৈধভাবে রাখার অভিযোগও রয়েছে, যা নেপালের আইনে নিষিদ্ধ।

দুটি ক্ষমতার কেন্দ্র?

বিশেষজ্ঞদের মতে— বালেন্দ্র শাহ (বালেন শাহ) এবং রবি লামিছানে-এর সম্পর্ক এবং তাদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে।

কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গেহেন্দ্র লাল মল্ল তাদের জোটকে ‘স্বার্থের বিয়ে’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

‘বালেনের নির্বাচনে অংশ নিতে একটি দলের প্রয়োজন ছিল, আর রবির দরকার ছিল বালেনের জনপ্রিয়তা। তবে পরে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে’—মনে করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

মল্ল আরও বলছিলেন, লামিছানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগগুলো মোকাবিলা করা শাহের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হবে।

‘নেপালে এমন একটি সংস্কৃতি রয়েছে যেখানে রাজনীতিবিদরা একে অপরকে রক্ষা করেন। শাহকে আইনের শাসন বজায় রাখতে হবে এবং নিজের দলের কাউকেও রক্ষা করা উচিত নয়।’

মল্ল আরও উল্লেখ করেন—আরএসপির সাফল্যের মূল কারণ ছিল শাহের জনপ্রিয়তা। দলটি এত বড় ম্যান্ডেট পেয়েছে মূলত বালেনের আকর্ষণের কারণে। এমনও হতে পারে, তিনি দলের সভাপতির চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন।

বিশ্লেষক বিষ্ণু সাপকোটার ভাষ্য, আরএসপির শীর্ষ নেতা লামিছানেসহ অন্যদের বোঝা উচিত— যে তাদের এই বিশাল জয় মূলত শাহের জনপ্রিয়তার ফল। তাদের এটি স্বীকার করে শাহকে তার পছন্দমতো মন্ত্রিসভা গঠনের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। অবশ্যই দল পরামর্শ দিতে পারে।

আরএসপি নেতা শিশির খানাল জানালেন, ‘তাদের আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমঝোতা হয়েছে—শাহ সরকার পরিচালনা করবেন এবং লামিছানে দল পরিচালনা করবেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আলাদা আলাদা ভূমিকা নির্ধারিত। দুজনকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

‘গত নির্বাচনী সময়ে আমি তাদের খুব কাছ থেকে একসাথে কাজ করতে দেখেছি। সিদ্ধান্তও তারা যৌথভাবে নিয়েছেন। তাই এখন পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতায়, তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব হবে না’— মনে করেন শিশির।

প্রথম ১০০ দিন

সাপকোটার মতে, শাহের রাজনৈতিক নতুনত্বই তার পক্ষে কাজ করতে পারে। ‘বালেনের ওপর দলীয় কর্মী বা অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর চাপ নেই। তাই আগের প্রধানমন্ত্রীদের তুলনায় তার স্বাধীনতা বেশি।’
শিশির জানালেন, প্রথম ১০০ দিন—যা ‘হানিমুন পিরিয়ড’—এর মধ্যেই মানুষ পরিবর্তন দেখতে শুরু করবে। দলটি দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেবে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯০ সাল থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সম্পদের তদন্ত।

আমরা একটি কমিশন গঠন করতে চাই, যা উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পদ তদন্ত করবে এবং স্থগিত থাকা বড় দুর্নীতির মামলাগুলো আবার চালু করবে। গত বছরের জেনজির আন্দোলনের এগুলোই দাবি ছিল—বলছিলেন খানাল।

অনেক তরুণ কর্মীর কাছে এই নির্বাচনের ফল আশা জাগালেও, তারা মনে করেন নতুন সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে।

২৩ বছর বয়সী জেনজি কর্মী যুজান রাজভান্ডারি বলছিলেন, ‘নতুন সরকারকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে—না হলে যে আন্দোলন তাদের ক্ষমতায় এনেছে, সেই আন্দোলন থেকেই আবার প্রতিরোধ আসবে। আরএসপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংসদে বিরোধী দল দুর্বল থাকবে, তাই রাস্তাই হবে প্রধান বিরোধী শক্তি।’

বড় সংস্কারের প্রশ্ন

তাৎক্ষণিক সংস্কারের বাইরে, নেপাল এখন বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রয়েছে—বিশেষ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কতটা হওয়া উচিত তা নিয়ে।

খানাল জানান, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার কিনা, তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হবে।

কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

শাহের সমালোচকরা তার কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অতীতে তার কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সমালোচনা করেছিলেন।

কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে তিনি অল্প সময়ের জন্য ভারতীয় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং ‘গ্রেটার নেপাল’ মানচিত্র প্রদর্শন করেছিলেন, যেখানে ভারতের কিছু অঞ্চলকে একটি বড় নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়।





    শেয়ার করুন: