মানবাধিকার লঙ্ঘন
প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিক্রিয়ায় বেশি মনোযোগী নেপাল সরকার

মানবাআওয়াজের সম্পাদক রমেশ প্রসাদ তিমালসিনা
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা, প্রসার এবং সম্মান নিশ্চিত করা। কোনো সরকারের সাফল্য তার জনপ্রিয় স্লোগান বা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বরং দেখতে হবে, দেশের মানুষ নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারছেন কি না। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে নেপালের সংবিধানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বর্তমান সরকারের বেশ কয়েকটি নীতি, সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনের প্রশ্নে সমালোচনার মুখে পড়েছে। নিজেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটি দেশে এ ধরনের উদ্বেগের জন্মই দুর্ভাগ্যজনক। সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত।
সুনসারির ঘটনা: একটি দৃষ্টান্ত
সহিংসতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু স্থাপনা ধ্বংস কিংবা সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। সহিংসতা নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত হানে। ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাস পালন করা প্রত্যেক মানুষের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার।
কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা বা বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড শুধু সামাজিক সম্প্রীতিই নষ্ট করে না, আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদাকেও দুর্বল করে। তাই এ ধরনের ঘটনাকে নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়; এগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যেখানে রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক মনোযোগ জরুরি।
এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে সুনসারি জেলার দেবানগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাপ্তানগঞ্জে। একটি ছোট বিরোধ পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। পরিস্থিতির মধ্যে পুলিশ গুলি চালালে ২৫ বছর বয়সী ওম প্রকাশ মেহতা নিহত হন। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জয় প্রকাশ মেহতাও চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে মারা যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো, দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা নিলে এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি অবহেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি বিরোধ প্রাণঘাতী ঘটনায় রূপ নেয়। এই অর্থে সুনসারির ঘটনা নাগরিকের জীবন রক্ষার মৌলিক দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সিরাহা জেলার সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতাও সরকারের প্রস্তুতি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সংঘাত প্রতিরোধ, সংলাপের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতা সামনে এনেছে। অশান্তির মধ্যে গণেশ যাদবের মৃত্যু এই ব্যর্থতার ভয়াবহ মানবিক মূল্য আরও স্পষ্ট করেছে।
শেষ পর্যন্ত সরকারকে বিচার করা হয়, তারা কতটা কার্যকরভাবে এমন বিপর্যয় প্রতিরোধ করতে পেরেছে–তার ভিত্তিতে। উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই উসকানিমূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বাড়তে থাকা অবিশ্বাস দমন করতে না পারা শাসনব্যবস্থার বড় দুর্বলতার পরিচয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম, জাতিসত্তা, ভাষা বা পরিচয়ের কারণে কোনো সম্প্রদায়েরই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কথা নয়। সংবিধান রাষ্ট্রকে বৈষম্য ছাড়াই প্রত্যেক নাগরিককে সমান সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সহিংসতা ঘটে যাওয়ার পর শুরু হয় না। সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার এবং ফৌজদারি মামলা শুরু করা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা প্রতিরোধমূলক নয়, প্রতিক্রিয়ামূলক শাসনের উদাহরণ। সরকারের প্রথম দায়িত্ব সম্ভাব্য ঝুঁকি আগাম শনাক্ত করা, সংঘাত তীব্র হওয়ার আগে সংলাপের পথ তৈরি করা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা এবং প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্র যখন এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তার পরিণতি শুধু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এমন ব্যর্থতা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করে এবং অবধারিতভাবে সরকারি জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে।
সুনসারি ও সিরাহার ঘটনাগুলো একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়– মানবাধিকার রক্ষা শুধু সংবিধান বা আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যেই তার প্রমাণ দিতে হবে।
এই ঘটনাগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত জরুরি, যাতে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা যায়। পাশাপাশি সহিংসতার অন্তর্নিহিত কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলাও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে নেপালকে মানবাধিকারভিত্তিক নিরাপত্তানীতি জোরদার করতে হবে, কার্যকর আগাম সতর্কতাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংলাপের পথ তৈরি করতে হবে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সঙ্কটের সময়ে একটি সরকার নাগরিকের অধিকার কতটা কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারে, তার ভিত্তিতে। সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে এই নীতির প্রতিফলন থাকা উচিত।
ভূমিহীন বসতিবাসীর দুর্দশা
নদী রক্ষা, সরকারি জমি সংরক্ষণ এবং অনানুষ্ঠানিক বসতি ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। তবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এসব লক্ষ্য পূরণের প্রতিটি পদক্ষেপকে মৌলিক মানবাধিকারের নীতির সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।
নেপালের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার, আইনের সামনে সমান আচরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই কোনো বসতি উচ্ছেদের আগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ, পর্যাপ্ত নোটিশ এবং উপযুক্ত পুনর্বাসন বা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এসব সুরক্ষা উপেক্ষা করা হলে পর্যাপ্ত আবাসন, মানবিক মর্যাদা এবং প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনার জায়গাটি নদী রক্ষা কিংবা অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সেই নীতি বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে।
মানবাধিকারের আলোকে দেখলে সমস্যা পরিবেশ রক্ষা বা নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যে নয়; সমস্যা রয়েছে এসব নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেখানে। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের নামে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জীবিকা এবং মানবিক মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনা অনিবার্য।
আজ এই উদ্বেগগুলো মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ক্রমশ আন্তঃসংযুক্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন বহু নজির রয়েছে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থা কার্যকর প্রতিকার দিতে ব্যর্থ হলে মানবাধিকার উদ্বেগ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জবাবদিহির কাঠামোর অধীনে পর্যালোচিত হয়েছে।
এই কারণে টেকসই সমাধানের জন্য পরিবেশ রক্ষা ও মানবাধিকারের মধ্যে উপযুক্ত ভারসাম্য দরকার। অনানুষ্ঠানিক বসতি ব্যবস্থাপনা হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও মানবিক পদ্ধতিতে, যেখানে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড–দুটোর প্রতিই সম্মান থাকবে। গণতান্ত্রিক শাসনের প্রকৃত চেতনা এখানেই।
আত্মাহুতির যন্ত্রণা
সাম্প্রতিক সময়ে আত্মাহুতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নেপালি সমাজ গভীরভাবে বিচলিত। এসব ঘটনাকে শুধু মানসিক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো একই সঙ্গে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগও।
অনেক ক্ষেত্রে আত্মাহুতির ঘটনা রাষ্ট্রের প্রতি গভীর জনহতাশা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, অসহনীয় ঋণ, বিচারপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ এবং দেশের দুর্বল সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন সতর্কসংকেত ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় ব্যক্তি আত্মাহুতির চেষ্টা করেছেন–তিনজন কাঠমান্ডুতে এবং একজন করে সারলাহি, রাউতাহাত ও কৈলালিতে। তাঁদের পাঁচজন ইতিমধ্যে মারা গেছেন, আর একজন চিকিৎসাধীন। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো রাষ্ট্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে এক কঠিন অভিযোগপত্র। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এমন ঘটনা গভীর উদ্বেগজনক। আরও বেদনাদায়ক হলো, কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই। সংবিধানে মানবাধিকারের যে অঙ্গীকার, তার সঙ্গে নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতার এ এক যন্ত্রণাদায়ক বৈপরীত্য।
নেপালের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক ব্যক্তিকে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন জীবিকা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিচারপ্রাপ্তির পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিক চরম হতাশার দিকে ঠেলে যেতে পারেন।
অনেক মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ সমাজ নিয়ে আসবে। সেই আশা পূরণ না হলে, কিংবা পূরণের কোনো সম্ভাবনাও দেখা না গেলে, জনহতাশা বাড়ে। অবাস্তব উচ্চ প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত গভীর হতাশার জন্ম দেয়। তাই রাজনীতিকে অবাস্তব প্রতিশ্রুতির বদলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার উপর দাঁড়াতে হবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মাহুতিকে শুধু ব্যক্তিগত বিপর্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক দায়িত্ব এবং বৃহত্তর মানবাধিকার প্রশ্নের প্রতিফলন হিসেবেও বুঝতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিঃসন্দেহে এসব ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, এবং স্বাস্থ্য নিজেই একটি মানবাধিকার। তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা যায় না।
একটি পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকার বিশ্লেষণে নাগরিকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক–সবই বিবেচনায় নিতে হবে। আত্মাহুতির ক্রমবর্ধমান ঘটনা ব্যক্তিগত মানসিক সঙ্কটের চেয়ে অনেক গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করে। এগুলো শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা, আশা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার পরিবেশ দেওয়ার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ঘাটতি প্রকাশ করে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সরকারের সমালোচনা, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন কিংবা সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত মতামতের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই নেপালের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় চাপ, ভয়ভীতি, সেন্সরশিপ কিংবা আইনের অপব্যবহার মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করছে বলে বিবেচিত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংবাদমাধ্যমের উপর আর্থিক চাপ, অনলাইন বিষয়বস্তুতে বাড়তি নজরদারি, সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং সরকারি নীতির সমালোচনার জবাবে সরকারি প্রতিক্রিয়া। এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা নিয়ে জনআলোচনা আরও তীব্র করেছে।
ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। তবে এ জন্য গৃহীত আইন এবং সেগুলোর প্রয়োগ অবশ্যই বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্য এবং বৈষম্যহীনতার নীতি পূরণ করতে হবে–আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও সেটিই দাবি করে।
অন্যথায় নাগরিকেরা সমালোচনামূলক মত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন, সাংবাদিকেরা আত্মনিয়ন্ত্রণের পথ বেছে নিতে পারেন এবং মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। দায়িত্বশীল ও আইনসম্মত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম নির্ধারক দায়িত্ব।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে শাসন
অধ্যাদেশ সংবিধানে রাখা একটি ব্যতিক্রমী আইন প্রণয়নব্যবস্থা। সংসদ অধিবেশনে না থাকলে এবং জরুরি আইনি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হলে শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে এর ব্যবহার হওয়ার কথা।
সংসদ ডাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বারবার অধ্যাদেশ জারি করা হলে সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। স্বাভাবিক আইন প্রণয়নপ্রক্রিয়া পাশ কাটানো হলে স্বচ্ছতা দুর্বল হয়, জনআলোচনা সীমিত হয়ে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি তিনটি অবিচ্ছেদ্য ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে: আইনের শাসন, নিয়মিত নির্বাচন এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান। গণতন্ত্র শুধু কে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রয়েছেন, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না; ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তিনেতার নয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও আইনি প্রক্রিয়ার।
সংসদই বৈধ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে জননীতি নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা এবং আইন প্রণয়ন হয়। তাই শাসন পরিচালিত হওয়া উচিত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রণীত আইনের মাধ্যমে, নির্বাহী বিভাগের সংক্ষিপ্ত পথ ধরে নয়।
স্বৈরশাসনে শাসকের ইচ্ছা আইনের উপরে স্থান পায়। প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জায়গা নেয় নির্বাহী আদেশ, নির্দেশনা এবং ব্যক্তিগত নির্দেশ। সরকার যখন কেবল আইনসভায় জবাবদিহি এড়াতে অধ্যাদেশের উপর নির্ভর করে সংসদকে পাশ কাটায়, তখন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
নাগরিকেরা কখনও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেননি। তাঁদের প্রশ্ন সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া বা দুর্বল করার চেষ্টা নিয়ে। আইনি প্রক্রিয়াকে যখন গণতান্ত্রিক সুরক্ষার বদলে বাধা হিসেবে দেখা হয়, তখন গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য ক্ষয় হতে শুরু করে। অধ্যাদেশ নিজে অবৈধ নয়; তবে সংসদকে পাশ কাটাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এর ব্যবহার গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
দশকের পর দশক গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির ছাপ রয়ে গেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বদলে নির্দেশের মাধ্যমে শাসন করবেন–এ যেন একটি সাধারণ প্রবণতা। যেখানে ব্যবস্থা কার্যকর থাকে না, সেখানে নিয়মের জায়গা নেয় ব্যক্তিগত নির্দেশ।
গণতন্ত্র মূলত প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির একটি ব্যবস্থা। প্রাতিষ্ঠানিক শাসন দুর্বল হলে মানবাধিকার রক্ষাও ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তাই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার অবিচ্ছেদ্য; একটিকে ছাড়া অন্যটি টিকে থাকতে পারে না।
জবাবদিহির সঙ্কট
সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাহী বিভাগকে সংসদের কাছে জবাবদিহি থাকতে হয়। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অনেক রাজনৈতিক নেতা আইনসভায় অনুপস্থিতি এবং জবাবদিহির অভাব নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে তাঁদের অনেকেই সেই একই আচরণের পুনরাবৃত্তি করেছেন, যার সমালোচনা একসময় নিজেরাই করেছিলেন। এতে জনআস্থা ক্ষয় হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাংবিধানিক দায়িত্ব সংসদের অধিবেশনে নিয়মিত উপস্থিত থাকা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা। এসব দায়িত্ব পালনে সরকারের ঘাটতি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্বাচিত জনগণের পক্ষে কথা বলেন। তাই সংসদীয় বিতর্কই সেই প্রধান ক্ষেত্র, যেখানে সরকার নাগরিকের কাছে জবাবদিহি থাকে। এই কারণেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের উপস্থিতি অপরিহার্য।
কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সংসদীয় সম্পৃক্ততা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বদলে সমাজমাধ্যমকে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। সমাজমাধ্যম নিঃসন্দেহে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা কিংবা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
প্রশ্নটি রাজনৈতিক নেতারা সমাজমাধ্যম ব্যবহার করবেন কি না, তা নিয়ে নয়–তাঁদের অবশ্যই ব্যবহার করা উচিত। উদ্বেগ তখনই, যখন সমাজমাধ্যম সংসদীয় দায়িত্বের পরিপূরক না হয়ে তার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের সারকথা হলো নির্বাচিত নেতারা জনগণের প্রতিনিধিদের সামনে, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের নজরদারির মধ্যে, সংসদে নিজেদের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা ও সমর্থন করবেন।
প্রাতিষ্ঠানিক এই ক্ষেত্রগুলো এড়িয়ে একমুখী ডিজিটাল যোগাযোগের উপর নির্ভর করলে সরকার জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও জনআলোচনার মতো গণতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধ দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত এমন চর্চা গণতান্ত্রিক শাসনের মান কমিয়ে দেয়।
কোনো সরকারের কার্যকারিতা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা দিয়ে নয়, মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের কাছে জবাবদিহির প্রতি তার অঙ্গীকার দিয়ে বিচার করা উচিত।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ভূমিহীন বসতিবাসীর দুর্দশা, আত্মাহুতির ঘটনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ, অধ্যাদেশের বিস্তৃত ব্যবহার এবং সংসদীয় জবাবদিহির অবনতি–সব মিলিয়ে নেপালে গণতান্ত্রিক শাসনের মান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
আত্মাহুতির ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নীতি এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারে দুর্বলতা প্রকাশ করে। একইভাবে সংসদের কাছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি, সরকারি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা, শান্তিপূর্ণ ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নগুলোতে অব্যাহত জননজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন।
মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিয়ে বাঁচতে পারেন। এর জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং জননীতির কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদাকে স্থান দেওয়া জরুরি।
শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রকৃত মাপকাঠি শাসকদের শক্তি নয়, সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত–সেটি। যে সরকার প্রতিক্রিয়ার চেয়ে প্রতিরোধ, সুবিধাবাদের চেয়ে জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়, সেই সরকারই একটি ন্যায়সঙ্গত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত সমাজের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে।
লেখক: সম্পাদক , মানবাআওয়াজ




