বারবার ‘মারা যান’ কিম জং উন, আবার ফিরেও আসেন— কেন ছড়ায় এমন গুজব?

কিম জং উনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তার এই ছবি প্রকাশ করেছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। ছবি: সংগৃহীত
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন আবারও ‘মারা গেছেন’। অন্তত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব তাই বলছিল।
দাবি করা হয়েছিল, তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তিনি কোমায় চলে গেছেন। চিকিৎসার জন্য গোপনে চীনের বেইজিংয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। এমনকি তার মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফেরত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি ছড়ায়।
কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই অন্য ছবি।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেখা গেল, কিম জং উন দিব্যি হাঁটছেন। পোশাক আর জুতা দেখছেন। সঙ্গে তার মেয়ে কিম জু অ্যা। আশপাশে যথারীতি কর্মকর্তাদের ভিড়।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন কিমের ‘মৃত্যু’ নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন উত্তর কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমে তিনি জুতা-পোশাক দেখায় ব্যস্ত।
তবে ঘটনা এখানেই শেষ নয়। কারণ কিম জং উনের ‘মৃত্যু’ নিয়ে এমন গুজব এবারই প্রথম নয়। কয়েক বছর পরপরই একই ঘটনা ঘটে।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
এবারের গুজব শুরু হলো যেভাবে
এবারের দাবি প্রথম ছড়ান যুক্তরাষ্ট্রে থাকা চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শিয়ে। তিনি নিজেকে চীনে নিষিদ্ধ চাইনিজ ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন।
তার দাবি ছিল, কিমের মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণ হয়েছে। উত্তর কোরিয়ায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় তাকে বেইজিংয়ে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
কিন্তু এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি শিয়ে। এর আগেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়ে যাচাই না হওয়া দাবি করেছিলেন তিনি।
এরপর উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে একটি পোশাক ও জুতা প্রদর্শনী ঘুরে দেখেছেন কিম। গতকাল মঙ্গলবার সেই ছবি প্রকাশ করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যুর খবর সমর্থন করার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
কিমকে নিয়ে কেন গুজব ছড়ানো এত সহজ
এর সবচেয়ে বড় কারণ উত্তর কোরিয়া নিজেই।
দেশটির ভেতরে কী ঘটছে, তা বাইরের বিশ্বের পক্ষে জানা অত্যন্ত কঠিন। কিম কোথায় আছেন, তার শরীর কেমন, কার সঙ্গে বৈঠক করছেন— এসব তথ্যও সবসময় সহজে পাওয়া যায় না।
কিম কয়েক দিন জনসমক্ষে না এলেই তাই শুরু হয় হিসাব। তিনি কোথায়, অসুস্থ নাকি, অস্ত্রোপচার হয়েছে নাকি আরও গুরুতর কিছু? তথ্যের এ শূন্যস্থান দ্রুত গুজবে ভরে যায়।
২০২০ সালেও ‘মারা গিয়েছিলেন’ কিম
এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে।
২০২০ সালে কিম বেশ কিছুদিন জনসমক্ষে ছিলেন না। তখন দক্ষিণ কোরিয়ার একজন সাবেক আইনপ্রণেতা ও উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’ যে কিম মারা গেছেন।
সেসময় বলা হয়েছিল, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিমের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পরই কিম জনসমক্ষে হাজির হন।
‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’ খবরটিও তখন ভুল প্রমাণিত হয়।
তাহলে কেন গুজব এত গুরুত্ব পায়
কারণ কিম জং উনের মৃত্যু শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যু হবে না। এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
দেশটি তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের হাতে।
কিম ইল সুংয়ের পর ক্ষমতায় এসেছিলেন তার ছেলে কিম জং ইল। এরপর ক্ষমতা পান কিম জং উন।
আগের দুবার উত্তরসূরি তৈরির একটি প্রক্রিয়া ছিল। কিন্তু কিম জং উনের পর কে ক্ষমতায় যাবেন, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।
এ অনিশ্চয়তাই তার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রতিটি গুজবকে বড় করে তোলে।
সামনে আসছেন কিমের মেয়ে
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিমের মেয়ে কিম জু অ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, তাকে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা আছে। জু অ্যার বয়স প্রায় ১৩ বছর বলে ধারণা করা হয়। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বেও আগে কখনো কোনো নারী আসেননি।
ফলে কিমের হঠাৎ কিছু হলে ক্ষমতা সরাসরি মেয়ের হাতে চলে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
আর এখান থেকেই আসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কিম না থাকলে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতা কার হাতে যাবে?
পারমাণবিক অস্ত্র কার হাতে থাকবে
এ প্রশ্নটিই দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। আছে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রও।
কিম হঠাৎ মারা গেলে বা গুরুতর অসুস্থ হলে ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে কি না, সেটি বড় উদ্বেগ।
আর যদি ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, তাহলে পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
সামরিক বাহিনীর ভেতরে বিভক্তি তৈরি হবে কি না
কোনো পক্ষ নিজের অবস্থান শক্ত করতে সামরিক উত্তেজনা বাড়াবে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে জানা কঠিন।
এ কারণেই কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে ছোট একটি খবরও ওয়াশিংটন, বেইজিং ও সিউলে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
কিমের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ আছে
কিমকে নিয়ে সব স্বাস্থ্য-আশঙ্কা যে একেবারেই ভিত্তিহীন, সেটিও বলা যায় না।
তার ওজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। তাকে নিয়মিত ধূমপান করতেও দেখা গেছে। তার পরিবারেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে।
ফলে কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আগ্রহও স্বাভাবিক।
কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও ‘কিম মারা গেছেন’ লিখে দেওয়া এক বিষয় নয়।
এবারের ঘটনাতেও সেই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।
গুজবের জন্য আদর্শ জায়গা উত্তর কোরিয়া
উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো গোপনীয়তা।
দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এত কঠিন যে অনেক সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও সম্ভাবনা ও অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সেই সুযোগটাই নেয় গুজব।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করলেন। অন্যরা সেটি ছড়িয়ে দিলেন। এরপর কয়েকটি সংবাদমাধ্যম খবর করল। মুহূর্তেই প্রশ্ন উঠল— কিম কি সত্যিই মারা গেছেন?
তারপর রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ছবি প্রকাশ করল।
দেখা গেল, ‘মৃত’ কিম জং উন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পোশাক আর জুতা দেখছেন।
এবারের গুজব আপাতত সেখানেই থামছে।
তবে উত্তর কোরিয়া যতদিন এমন বন্ধ ও গোপন রাষ্ট্র থাকবে এবং কিমের উত্তরসূরি নিয়ে যতদিন অনিশ্চয়তা থাকবে, ততদিন সম্ভবত এমন গুজবও ফিরতে থাকবে।
অর্থাৎ কিম জং উনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতেও হয়তো একই দৃশ্য দেখা যাবে— প্রথমে মৃত্যুর গুজব, তারপর হঠাৎ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে নতুন ছবি।
সূত্র : বিবিসি








