উদ্ধার তৎপরতায় ব্যর্থতা
সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসছে নেপাল

ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা ও রাসুয়ায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর স্থানীয় বাসিন্দারা এখন শুধু রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নয়, খাবার ও আশ্রয়ের তাৎক্ষণিক সংকটেও পড়েছেন।
রাসুয়ায় বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানির পরও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা। রাসুয়ার উত্তরগয়া গ্রামীণ পৌরসভার চেয়ারম্যান মাধব আরিয়াল বলেন, উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসায় দ্রুত এবং কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। তার ভাষ্য, নুয়াকোটের বান্দ্রের পর আরও দুই গ্রামে গিয়ে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখলে সাধারণ মানুষ শুধু বিদুর পৌরসভাতেই সরকারের উপস্থিতি দেখতে পান। তিনি বলেন, মানুষ অভিযোগ করছে, কালো সানগ্লাস পরে আকাশে ও সামাজিক মাধ্যমে সরকারকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই সানগ্লাস দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ দেখা যাচ্ছে না।
চেয়ারম্যান আরিয়ালের ভাষ্য, বন্যায় বেথ্রাবতী বাজার, কাইদলেটার, পাইরেবেসি, সাল্লেটার ও মাইলুংয়ে অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত হয়ে গত ১১ বছর ধরে অস্থায়ী বসতিতে থাকা প্রায় ৩০০ পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশুলি-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক এবং আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত কোরীয়, চীনা, ভারতীয় ও নেপালি শ্রমিকদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁদের কেউ কেউ টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলেও খবর পাওয়া গেছে।
গোসাইনকুণ্ড ও মানসসরোবরের উদ্দেশে যাওয়া নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও উদ্ধারের জন্যও স্বজনেরা আবেদন জানাচ্ছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান আরিয়াল। তার মতে, তিমুরে ও সিয়াব্রুবেশিতে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে। আর মাইলুং, সাল্লেটার, পাইরেবেসি, কাইদলেটার ও বেথ্রাবতীতে ধ্বংসযজ্ঞ আরও বেশি। বিপুলসংখ্যক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন।
আরিয়াল বলেন, গুরুতর আহতদের সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় তার আবেদনে সাড়া দেওয়া হয়নি। ফলে গুরুতর আহত কয়েকজনকে কালিকাস্থান ও জিবজিবের হাসপাতাল হয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর ধুনছে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।
আরিয়াল বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় নদীর তীরে সারি সারি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। স্বজনেরা শনাক্ত করার পরও অনেক মরদেহ তাৎক্ষণিকভাবে সৎকার করা সম্ভব হয়নি। মাঠপর্যায়ে পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া কিছু করার নেই। নদীর তীরে মরদেহ পচতে শুরু করায় আশপাশের বসতিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন। আর যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তারাও সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কালিকাস্থানে একজন পরিদর্শকসহ প্রায় পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
সরকারের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আরিয়াল বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি টের পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, একটি সমবায় কার্যালয়ের ব্যাকআপ বিদ্যুৎ দিয়ে মোবাইল চার্জ করে পরে প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট পড়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, তাঁরা যে এলাকায় রয়েছেন, সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারকে শুধু আকাশে ও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।
নুয়াকোটের সাংবাদিক ও আইনজীবী নবদীপ শ্রেষ্ঠও একই অভিযোগ করেছেন। তার মন্তব্য, সুনামির পর যে সরকারের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল, তুলনামূলকভাবে ছোট এই বন্যার পরও তার চেয়ে কম দৃশ্যমান সরকার। শুধু সামাজিক মাধ্যমে তথ্য ও প্রতিশ্রুতি প্রকাশ না করে সরকারকে সরাসরি দুর্যোগকবলিত এলাকায় গিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। এতে মানুষ বাস্তবে সরকারের উপস্থিতি অনুভব করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরিয়াল বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে কথা বলার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সচিবালয় থেকে তাকে ফোন করা হয়। তাকে নেতিবাচক প্রচার বা রাজনীতিতে জড়াতে নিষেধ করা হয় বলে দাবি তার। জবাবে তিনি বলেন, সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করুক, যাতে স্থানীয় প্রতিনিধিদের এ ধরনের অভিযোগ তুলতে না হয় এবং মানুষ সত্যিকার অর্থে সরকারের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি দলও তাকে সহায়তা অপর্যাপ্ত বা সরকারি তৎপরতা অকার্যকর—এ ধরনের কথা না বলতে চাপ দিয়েছে বলে আরিয়ালের দাবি। তার এই অভিযোগে দুর্যোগ পরিস্থিতি নিয়ে সরকার তথ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের কার্যকর টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। পুলিশ সদস্যদের ওয়াকিটকির মাধ্যমে সীমিত যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। বিদ্যুৎ নেই, নির্ভরযোগ্য মোবাইল নেটওয়ার্কও নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কখনো নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে তাঁরা সামাজিক মাধ্যমে সরকারের ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতার পোস্ট দেখতে পান। এতে তাঁরা আরও হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছেন।
গোসাইনকুণ্ড গ্রামীণ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান ধুনছের দাওয়া সিদার ওয়াইবা বলেন, বন্যার পানির উচ্চতা আবারও বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো বিপজ্জনক নয়। ভোতেকোশি নদীর আশপাশে বসবাসকারী মানুষ এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিতদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নদীর তীরে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। নদীর পানি এখনো ফুলে-ফেঁপে থাকলেও বুধবারের মতো প্রবাহ তীব্র নয়।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভোতেকোশি নদীর বন্যার পর এখন পর্যন্ত ৪৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর বেশিরভাগেরই পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সারা দেশের হাসপাতালগুলো একসঙ্গে প্রায় ৩০০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রাখে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডা. গোপাল চৌধুরী বলেন, নেপালের হাসপাতালগুলোতে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য হিমায়িত মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০টি জায়গা রয়েছে। বড় ধরনের দুর্যোগে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পচতে থাকা মরদেহ ব্যবস্থাপনায় রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের গুরুতর শ্বাসকষ্ট ও রাসায়নিকজনিত নিউমোনিয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। বরফ গলে তৈরি হওয়া তরল পদার্থের মাধ্যমে দূষিত উপাদান আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা ও রাসুয়ায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর স্থানীয় বাসিন্দারা এখন শুধু রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নয়, খাবার ও আশ্রয়ের তাৎক্ষণিক সংকটেও পড়েছেন। ঘরবাড়ি, সড়ক, খাবার পানির ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
ওয়ার্ড চেয়ারম্যান ওয়াইবা বলেন, বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে আসা আবর্জনা, মানুষের ও প্রাণীর দেহাবশেষ এবং দূষিত পানি খাবার পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
দুর্যোগের পর নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য, অস্থায়ী আশ্রয়, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন বড় জরুরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, স্যানিটেশন ব্যবস্থা জোরদার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিখোঁজ স্বজন, প্রতিবেশী ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা অন্যদের নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আগামী দিনগুলোতে খাবার ও আশ্রয় কীভাবে জোগাড় করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
সম্ভাব্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন, পানি বিশুদ্ধকরণ, স্যানিটেশন কার্যক্রম এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
রাসুয়ার এই বন্যা তাই এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও জবাবদিহির সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামোর ধ্বংসের পাশাপাশি উদ্ধারকাজে বিলম্ব, নিখোঁজ মানুষ, মরদেহ ব্যবস্থাপনায় সংকট, খাবার ও নিরাপদ পানির ঘাটতি এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেঁচে থাকা মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
মাঠে সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করা স্থানীয় প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অভিযোগ এবং সামাজিক মাধ্যমের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকার ধারণা সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
এই সংকটময় মুহূর্তে সরকারকে দোষারোপ ও প্রচারের বাইরে গিয়ে সমন্বিত জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে থাকতে হবে উদ্ধার অভিযান, মরদেহের মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও পরিচয় শনাক্তকরণ, নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা, অস্থায়ী আশ্রয় এবং পুনর্বাসন। তবেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষ সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করতে পারবে। তা না হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট মানবিক সংকট সরকারি তৎপরতার ঘাটতির কারণে আরও বড় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।







