দেশের জন্য রাত জাগা, নাকি বিপদের সংকেত?
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ঘুম নিয়ে তোলপাড়
- একজন প্রধানমন্ত্রী কত ঘণ্টা কাজ করছেন–তা নয়, তিনি কতটা সুস্থ ও স্থিরভাবে দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন–সেটিই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি
রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততা, একের পর এক নথি পর্যালোচনা, সরকারি বৈঠক–সব মিলিয়ে বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের জীবন যে কঠিন কর্মসূচিতে বাঁধা, তা নতুন নয়। কিন্তু জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুমের হিসাব প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
প্রধানমন্ত্রীর নিজের কথাতেই জানা গিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অনেক রাতে তাঁর ঘুম নেমে এসেছে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টায়। আর সেই স্বীকারোক্তিই জাপানে তৈরি করেছে উদ্বেগ–দেশের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন ঘুমের অভাবে থাকেন, তবে তার প্রভাব কি জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পড়তে পারে?
গত ২০ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ নিজের একটি পোস্টে তাকাইচি জানান, ছুটির দিনে তিনি “অনেক দিন পর টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরেছেন।”দিনটি ছিল জাপানের পাবলিক হলিডে। কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক রুটিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লেখেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে “শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, ছুটির দিনেও বিশ্রামের বদলে তিনি সরকারি নথি পড়েছেন, জমে থাকা হাজার হাজার ই-মেইলের উত্তর দিয়েছেন। পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত কাজও করেছেন–কাপড় ইস্ত্রি করা, পোশাকের ছোটখাটো মেরামত করা এবং ঘরের কাজ সামলানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
কিন্তু যে বার্তা তিনি সম্ভবত কর্মনিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, সেটিই উল্টো প্রশ্ন তুলেছে জাপানে।
“ঘুমের অভাব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে”
বিরোধী দলের সাংসদ তোরু কুনিশিগে সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিনের ঘুমের অভাব মানুষের বিচারক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে। তাঁর বক্তব্য, ঘুমের ঘাটতি অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মদ্যপ অবস্থার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—যা জাতীয় সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরেক বিরোধী নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সময় কি এমন কাজেই ব্যয় হওয়া উচিত নয়, যা শুধু তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব?
সরকার অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে। জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পোস্টটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের বক্তব্য। তবে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের গুরুত্ব বোঝেন।
‘অতিরিক্ত কাজ’ নিয়ে পুরনো সমস্যায় নতুন বিতর্ক
জাপানের সমাজে অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। দেশটিতে ‘কারোশি’–অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যু–একটি পরিচিত সামাজিক সমস্যা। ফলে একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন কর্মসংস্কৃতির উদাহরণ আসা নিয়েই অনেকের আপত্তি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশ্রাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
“কাজ, কাজ আর কাজ”: তাকাইচির পুরনো বার্তা
তাকাইচি এর আগেও নিজের কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, নিজের ক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত “কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য” ধারণা থেকে সরে গিয়ে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে চান। তাঁর বক্তব্য ছিল–তিনি “কাজ করবেন, কাজ করবেন এবং আরও কাজ করবেন।”
এর আগে রাত তিনটায় সরকারি কর্মীদের বৈঠকে ডাকায় তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন নেতার ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি কি প্রশাসনের অন্য কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে না?
জাপানে নতুন প্রশ্ন: নেতার ত্যাগ, নাকি বিপজ্জনক সংস্কৃতি?
বিশ্বের বহু দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় কাজ করাকে প্রায়ই নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। রাত জেগে ফাইল দেখা, কম ঘুমিয়ে বেশি কাজ করা–এসবকে অনেক সময় সফলতার গল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কিন্তু জাপানে তাকাইচির ঘটনা সেই ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
একজন প্রধানমন্ত্রী কত ঘণ্টা কাজ করছেন–তা নয়, তিনি কতটা সুস্থ ও স্থিরভাবে দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন–সেটিই কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?
তাকাইচির ঘুমের হিসাব তাই শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত অভ্যাসের গল্প নয়। এটি জাপানের সমাজে বহুদিনের এক প্রশ্নকে সামনে এনেছে: সাফল্যের জন্য মানুষ কতটা নিজের শরীর ও বিশ্রামকে বিসর্জন দেবে? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এখন গোটা জাপান।
ভাষান্তর: ইরফান রহমান




