রুশ সমর্থিত মিয়ানমারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান

মিয়ানমারে দাউয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল- সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রাশিয়া সমর্থিত মিয়ানমারে দাউয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ডিএসইজেড) প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। সেজন্য দেশটির দক্ষিণ সীমান্ত এলাকায় উচ্ছেদ ও সেনা অভিযান জোরদার করেছে জান্তা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, তানিনথারি অঞ্চলের ইয়েব্যু জনপদে প্রকল্প এলাকার কাছাকাছি এই বিশেষ সামরিক উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে জান্তা বাহিনী।
দাউয়ে জেলা পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ)-এর একজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার দ্য ইরাবতীকে বলেছেন, ‘প্রায় এক সপ্তাহ আগে জান্তা বাহিনী ডিএসইজেডের দিকে অগ্রসর হয়ে এই অভিযান শুরু করে।’
তিনি জানান, কালিন অং এবং থায়েতচংয়ের পদাতিক ব্যাটালিয়নগুলোর ৫০০-এর বেশি জান্তা সেনা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে ইয়েব্যু ও কানপক শহরের বিভিন্ন গ্রামের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
গত ২২ জুন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান চ সোয়ার লিন মেইক ও কিউনসু সেনা ছাউনি পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি উত্তর দিকের ‘ইয়ে’ শহর থেকে শুরু করে একেবারে দক্ষিণে ‘কওথং’ পর্যন্ত বিস্তৃত ৮ নম্বর জাতীয় মহাসড়ক থেকে পিডিএফ যোদ্ধাদের ‘সম্পূর্ণ নির্মূল’ করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি হতে যাওয়া এই মেগা প্রকল্পটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। এই সফরের পরই মূলত সেনা অভিযান শুরু হয়।
তবে এই অভিযানের পুরো ধকল পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দাউয়ে ওয়াচ’ জানিয়েছে, ইয়েব্যুর সাতটি গ্রাম থেকে মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এসব গ্রামে অবস্থান নেওয়া জান্তা সেনারা সাধারণ মানুষের সম্পদ লুটপাট করছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং গ্রামবাসীদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য গ্রেপ্তার করছে।
বাস্তুচ্যুত গ্রামবাসীদের সহায়তাকারী স্থানীয় এক বাসিন্দা দ্য ইরাবতীকে জানান, ‘জান্তা সেনারা পুরুষদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আটক করা পুরুষেদের কাজে লাগানো হচ্ছে সেনাদের গাড়িতে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে। একই সঙ্গে তাদের মানবঢাল হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ভয়ে গ্রামবাসীরা ঘরে ফিরতে পারছেন না।’
ডিএসইজেড ও রাশিয়ার স্বার্থ
আন্দামান উপকূলে অবস্থিত ১৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দাউয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি মূলত ২০০৮ সালে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইয়েব্যু জনপদকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করা।
মূল পরিকল্পনায় ছিল একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, ইস্পাত কারখানা, তেল শোধনাগার ও পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট তৈরি করা। এ ছাড়া প্রকল্পের নিজস্ব জলাধার এবং থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুরির সঙ্গে সংযোগকারী একটি সুপারহাইওয়ে তৈরির কথাও ছিল।
তবে তহবিলের অভাব এবং স্থানীয় জনগণের তীব্র বিরোধিতার কারণে প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ২০২৫ সালের শুরুর দিকে, আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া সামরিক জান্তা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে এই থমকে যাওয়া প্রকল্পটি রুশ বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। দিন দিন জান্তা সরকার অস্ত্র কেনাকাটা ও সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতাও বাড়াতে চাইছে।
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাউয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রুশ বিনিয়োগের বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর গত মাসের শুরুর দিকে মিয়ানমারের নতুন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিও সওয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রাশিয়া সফর করে। সেখানে মিয়ানমারের লংলাং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট এবং রাশিয়ার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাউয়েতে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।






