নথিতে ডিজেল, জাহাজে জেট জ্বালানি
নিষেধাজ্ঞার চোখে ধুলো দিয়ে ইরানের তেল মিয়ানমারে

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এড়াতে কাগজ-কলমে ডিজেল অথচ জাহাজের পেটে ইরানের জেট জ্বালানি! দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলো কীভাবে নিষেধাজ্ঞাধীন জ্বালানি আমদানির পরিচয় গোপন করেছে, সে চিত্রই গতকাল সোমবার সামনে এনেছে রয়টার্স। সংবাদ সংস্থাটির দাবি, ১৫৮ লাখ ডলারের একটি চুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ডিজেল কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে জেট জ্বালানি আনা হয়েছিল ইরান থেকে। চুক্তির নথি, জাহাজের গতিপথ, উপগ্রহচিত্র এবং জ্বালানি পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানী এ প্রতিবেদনটি তৈরি করে রয়টার্স।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘রিফ’ নামে একটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞাধীন ট্যাংকার প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল জ্বালানি নিয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় পৌঁছায়। মিয়ানমারের জ্বালানি ব্যবসায়ী সংস্থা ডায়নামিক ওয়েভ এবং থাইল্যান্ডের তাওয়ান-অয়েল ট্রেডিংয়ের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে জ্বালানিটিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ডিজেল বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের তথ্য এবং জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি-সংক্রান্ত সংস্থা ভরটেক্সার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মিয়ানমারে এমন কোনো বাণিজ্যই হয়নি। সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্সের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ট্যাংকারটি ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে জ্বালানি নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে গিয়েছিল।
এই কারবারে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ভূমিকারও ইঙ্গিত মিলেছে। রয়টার্সের হাতে আসা ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের একটি গোপনীয় চিঠিতে দেখা যায়, বিদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আমদানির নথিতে জেট জ্বালানির পরিবর্তে ‘ডিজেল’ লেখার কথা জানিয়েছিল। একই সঙ্গে ডায়নামিক ওয়েভ এবং তার ক্রেতা ন্যাশনাল এনার্জি প্রাইম অ্যাভিয়েশন সার্ভিসেস কোম্পানিকে তাওয়ানকে অর্থ দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়। সংস্থাটির আংশিক মালিকানায় রয়েছে সামরিক-সমর্থিত সরকার। সংশ্লিষ্ট সংস্থা, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মার্কিন অর্থ দপ্তর এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
২০২৩ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বেসামরিক এলাকায় প্রাণঘাতী বোমাবর্ষণের অভিযোগে দেশটির জেট জ্বালানি শিল্পের ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। ইরানের তেল ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে। ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের পর থেকে গৃহযুদ্ধে জড়িয়েছে মিয়ানমার। রাষ্ট্রপুঞ্জের দাবি, সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় বহু বেসামরিকসহ হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদিও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্ষতি এড়াতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সংযম দেখায়।
এই একই কৌশলের নজির মিলেছিল ২০২৫ সালের মে মাসেও। সেবার ২ লাখ ২ হাজার ব্যারেল তথাকথিত দক্ষিণ আফ্রিকার ডিজেল কেনার জন্য ২৬০ লাখ ডলারের চুক্তি করে ডায়নামিক ওয়েভ। চালানে জ্বালানির ঘনত্বের হিসাব জেট জ্বালানির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে। দামও আন্তর্জাতিক ডিজেলের মানদরের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। পরে ‘নোবল’ নামে একটি ট্যাংকার প্রায় ২ লাখ ব্যারেল জেট জ্বালানি নিয়ে ১৭ জুন ইয়াঙ্গুনে পৌঁছায়। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানিটি ইরান থেকেই এসেছিল। যাত্রাপথে জাহাজটি অবস্থান-সংকেত এমনভাবে পাঠিয়েছিল, যাতে গন্তব্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বলে মনে হয়।
চুক্তিতে অর্থ পাঠানোর জন্য থাইল্যান্ডের প্রাচীনতম ব্যাংক সিয়াম কমার্শিয়াল ব্যাংকের (এসসিবি) একটি অ্যাকাউন্টের উল্লেখ ছিল। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে তাওয়ানকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জেট জ্বালানি সরবরাহকারী এবং এসসিবিকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ব্যাংকটি জানিয়েছিল, তাদের লেনদেন অর্থ পাচারবিরোধী আইন মেনে চলে এবং অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে এই নির্দিষ্ট কারবার সম্পর্কে ব্যাংকটি অবগত ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। থাই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০২৪ সালে মিয়ানমার-সংক্রান্ত লেনদেনে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দিয়েছিল।
‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ নামে একটি সংগঠন জান্তার সার্ভারে সাময়িকভাবে উন্মুক্ত থাকা নথি থেকে চুক্তিগুলো সংগ্রহ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ইরান ছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান জেট জ্বালানি সরবরাহকারী। ‘রিফ’— যার নতুন নাম ‘ম্যারিস’— এবং ‘নোবল’ ছিল এই বাণিজ্যের অন্যতম বাহক। ২০২৬ সালেও ইরান থেকে মিয়ানমারে জেট জ্বালানি পৌঁছানোর তথ্য সামনে এসেছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে জ্বালানির পরিচয় আড়াল করার এ কৌশল যেমন ওয়াশিংটনের চাপের প্রভাব দেখায়, তেমনই স্পষ্ট করে— সেই চাপ সত্ত্বেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে ইরান পাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা, আর মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের হাতে থাকছে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল ও বিমান হামলা চালানোর জ্বালানি।



