চাদে সুদানি শরণার্থী
রক্তের পথ পেরিয়ে, তৃষ্ণার মরুভূমিতে জীবন

চাদের তুলুম শরণার্থী শিবিরে সুদানি নারীরা- রয়টার্স
পূর্ব চাদের গুদ্রানে শরণার্থী শিবিরে টানা চার দিন ধরে পানির ট্যাংকগুলো একেবারে খালি ছিল। প্রায় ৫০ হাজার সুদানি শরণার্থীর আবাস এই শিবিরে যখন একটি পানিবাহী ট্রাক পাহাড়ি ঢাল পেরিয়ে ঢুকতে শুরু করে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শেষ আশা।
জ্বলন্ত বালুর ওপর দিয়ে শত শত মানুষ ট্রাকটির দিকে দৌড়ে যায়। অনেক পরিবারের কাছে একটি জেরিক্যানে পানি ভরতে পারা মানেই আরেকটি দিন টিকে থাকা।
ভিড়ের সামনের সারিতে থাকা নারীরাই প্রথম পড়ে যান। তাদের চিৎকারের মধ্যেই শিশুরা তাদের গা বেয়ে এগিয়ে যায়। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, কারও হাত থেকে ছিটকে পড়ে পানির পাত্র। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ট্রাকটির ৬ হাজার লিটার পানি শেষ হয়ে যায়।
৪৩ বছর বয়সী সুদানি স্কুলশিক্ষক রোখিয়া ইব্রাহিম দেখছিলেন, তার হতাশ শিক্ষার্থীরা খালি বালতি হাতে ফিরে যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘এক বছরেরও কম সময় আগে এল-ফাশির থেকে পালানোর সময় আমি এ রকম শিশুদের তৃষ্ণায় মারা যেতে দেখেছি।’
পানির সংকট
এ মাসে আলজাজিরা পূর্ব চাদের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া কয়েক ডজন সুদানি শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে ছিলেন রোখিয়া ইব্রাহিমও। সুদানে ভয়াবহ সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এলেও এখন তারা বেঁচে থাকার জন্য নতুন এক লড়াই করছেন।
অনেকের কাছে পানির সন্ধান এখন সেই দুর্ভোগেরই আরেকটি অধ্যায়, যা শুরু হয়েছিল সুদান থেকে পালানোর মধ্য দিয়ে।
এক বছরেরও কম সময় আগে এল-ফাশিরের সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে আসেন ইব্রাহিম। তার ভাষ্য, পালানোর পথে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) তাদের পরিবারের ওপর হামলা চালায়। প্রধানত আরব এই আধাসামরিক বাহিনী ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (এসএএফ) সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত।
ইব্রাহিম বলেছেন, তার শিশুসন্তানকে পিঠ থেকে ছিনিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। তার স্বামীকে মাথায় বারবার লাথি মারা হয়। এতে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান।
চোখে অশ্রু নিয়ে তিনি বললেন, ‘সৈন্যরা আমাদের সামান্য যে পানিটুকু ছিল, সেটাও মাটিতে ঢেলে দিয়েছিল। আর এখন আবারও আমরা প্রায়ই পানি পাচ্ছি না।’
সহায়তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর ৯ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি সুদানি শরণার্থী প্রতিবেশী চাদে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই দেশটির শুষ্ক পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত জনাকীর্ণ শিবিরগুলোয় বাস করছেন। সেখানে অনেক শরণার্থী জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মানবিক মানদণ্ডে নির্ধারিত দৈনিক ন্যূনতম পানির অর্ধেকেরও কম পানি পাচ্ছেন।
গুদ্রানে শিবিরের চিকিৎসাকেন্দ্রে তরুণ মায়েরা চিকিৎসার জন্য সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু শিবিরটির একমাত্র চিকিৎসক এমন এক সমস্যার মুখোমুখি, যা শুধু ওষুধ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি আলজাজিরাকে বললেন, ‘সংক্রমণ ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের ওষুধ আমাদের আছে। কিন্তু বিশুদ্ধ পানি ছাড়া সেই ওষুধও ঠিকমতো খাওয়া যায় না।’
ফরাসি মানবিক সংস্থা সলিদারিতে ইন্টারন্যাশনাল ২০০৮ সাল থেকে চাদে কাজ করছে। সংস্থাটির মতে, পূর্বাঞ্চলের শরণার্থী শিবিরগুলোয় তৈরি হওয়া পানির সংকট তাদের দেখা সবচেয়ে জরুরি মানবিক পরিস্থিতিগুলোর একটি।
সংস্থাটির চাদবিষয়ক পরিচালক থিবো অঁরি বললেন, ‘শিবিরগুলোয় বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বাড়াতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু বর্তমান অর্থায়ন সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।’
তিনি জানিয়েছেন, শরণার্থীর সংখ্যা ও চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু বিদ্যমান নলকূপ, পাইপলাইন, স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং পানি পরিশোধনসেবার সক্ষমতা সেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
পালানোর পথও ছিল মৃত্যুর ফাঁদ
সুদানে যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, ততই নতুন নতুন শরণার্থী চাদে আসছেন। তাদের শরীর ও মনে বহন করে আনছেন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন।
সুদান সীমান্তবর্তী আদ্রে ট্রানজিট শিবিরে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা আরএসএফ এবং তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয়াবহ হামলার বর্ণনা দিয়েছেন। সবচেয়ে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার অনেকগুলোই ছিল অবরুদ্ধ শহর ও গ্রাম ছেড়ে পালানোর পথে।
জাহরা খামিসের বাড়ি পশ্চিম দারফুরের এল-জেনেইনা শহরে, যা চাদ সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু ২০২৩ সালে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার কাছে পথটি যেন কখনোই শেষ হচ্ছিল না।
তিনি জানিয়েছেন, তিনি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার বাড়িতে বারবার হামলা হয়েছে এবং প্রায় ৫০ দিন ড্রোন হামলার মধ্যে থাকতে হয়েছে। এলাকায় পানি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাজারগুলো বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়ায় খাবারেরও তীব্র সংকট দেখা দেয়।
পরে পালানোর একটি সুযোগ পান তিনি।
খামিস বললেন, ‘গুলি আর ড্রোন এড়িয়ে আমরা কোনোভাবে রাস্তায় পৌঁছাই। তারপর দেখি চারদিকে শুধু ভাঙাচোরা আর রক্তাক্ত লাশ— ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধা নারী পর্যন্ত, সবাই রাস্তার ওপর পড়ে আছে।’
সীমান্তের অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তিনি বললেন, ‘আমাদের সামনে এগোনো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেই পথে অসংখ্য মানুষ মারা গেছে।’
খামিস মাসালিত সম্প্রদায়ের সদস্য। আফ্রিকান এই জাতিগোষ্ঠীকে পুরো সংঘাত জুড়েই আরএসএফ পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এল-জেনেইনা এবং আশপাশের এলাকায় মাসালিতদের ওপর হামলাকে জাতিগত নিধনের শামিল বলে বর্ণনা করেছেন।
খামিস বললেন, ‘যুদ্ধের আগুন প্রথম আমাদের গায়েই লেগেছিল।’
ঘরে ফেরার আশা ক্ষীণ
চতুর্থ বছরে গড়ানো সুদানের যুদ্ধ এখন দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাত যত বাড়ছে, ততই আরও শরণার্থী চাদে আশ্রয় নিচ্ছেন। এই যুদ্ধে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ একে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক ও বাস্তুচ্যুতি সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেনি। একই সঙ্গে আরএসএফ ও এসএএফ—উভয় পক্ষকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে কয়েকটি দেশের ভূমিকাও ক্রমেই বেশি সমালোচনার মুখে পড়ছে।
অতিরিক্ত জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরে বেঁচে থাকার সংগ্রামে থাকা সুদানিদের কাছে দেশে ফেরার আশা দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
৫৩ বছর বয়সী ফাতনে আদম বললেন, ‘যুদ্ধে আমি আমার স্বামী ও ছেলেকে হারিয়েছি। পালানোর সময় স্নাইপারের গুলিতে দুজনই নিহত হন।’
তিন বছরের বেশি সময় ধরে পূর্ব চাদের মেতশে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘একদিন আমি সুদানে ফিরতে চাই। কিন্তু সেটা তখনই, যখন আবার শান্তি ফিরে আসবে। সেই দিন কবে আসবে, তা কেউ বলতে পারে না।’





