পাকিস্তানের খাইবার সীমান্তেই ডুবছে লং মার্চের সূর্য

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেন আরেকটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকল গতকালের দিনটি— রবিবার। দিনের আলো ফুটতেই উল্টে গেল সব! যে লং মার্চকে ইসলামাবাদে ঢুকতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ দিয়ে আসছিলেন, সেটি রাজধানী দূরের কথা; তার প্রবেশ দরজারই মুখ দেখল না শেষ পর্যন্ত! তার আগেই খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি হলো। নির্বাচিত পিটিআই সরকারের ক্ষমতা স্থগিত হলো। শুরু হলো ধরপাকড়। আর আট দিনের মিছিল আটকে গেল নিজেরই রাজনৈতিক দুর্গে। এখানেই ধারালো হয়ে উঠল সেই শানিত প্রশ্নটি— ইমরান খানের ঘাঁটি খাইবার সীমান্তেই কি ডুববে লং মার্চের সূর্য?
গতকাল ডন এবং জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন অনুমোদন করেছেন। পরে গেজেট জারি হয়। গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দির হাতে প্রাদেশিক নির্বাহী ক্ষমতা গেছে। ১১ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদও থাকবে। ইসলামাবাদেও জারি হয়েছে লাল সতর্কতা। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য থাকবে।
কেন্দ্রের যুক্তি, খাইবার পাখতুনখাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের হামলা বেড়েছে। শাহবাজ শরিফের অভিযোগ, কেন্দ্রের বিপুল অর্থ পেলেও প্রাদেশিক সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। পিটিআই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান সিদ্ধান্তটিকে ‘গুরুতর রাজনৈতিক ভুল’ বলেছেন। ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ জুলফিকার বুখারির ভাষায়, এটি আরও ‘রক্তপাত, অস্থিতিশীলতা ও ক্ষতি’ ডেকে আনতে পারে।
জরুরি ব্যবস্থার সাংবিধানিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২৩২ অনুচ্ছেদ জরুরি অবস্থা ঘোষণার সুযোগ দেয়। ২৩৪ অনুচ্ছেদে কোনো প্রদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে কেন্দ্রকে কিছু বা সব দায়িত্ব গ্রহণের পথ রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত সংসদের অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মধ্যেও যাবে। জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের পৃথক অধিবেশন আগামী মঙ্গলবার ডাকা হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্তটি নতুন সংসদীয় সংঘাতও ডেকে আনতে পারে।
এটি শুধু লোকদেখানো। আসল কেচ্ছা তো সবার জানা— ইমরান খান! ২০২৩ সাল থেকে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিসহ কয়েকটি মামলায় সাজা পেয়েছেন, যদিও তার বেশ কয়েকটি সাজা পরে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। তিনি অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেছেন। পিটিআইয়ের প্রধান দাবি তার মুক্তি। সঙ্গে মামলার দ্রুত শুনানি, পরিবার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকের প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক দমন বন্ধের দাবিও রয়েছে। রয়টার্স গতকাল জানিয়েছে, ইমরানের বিরুদ্ধে হওয়া দণ্ডগুলোর একটি ছাড়া বাকিগুলো স্থগিত বা বাতিল হয়েছে এবং আপিল বিচারাধীন।
পাকিস্তানে লং মার্চের বীজ পড়েছিল গত ৫ আগস্ট। ইমরান খানের কারাবাসের তিন বছর পূর্তির দিনে পেশোয়ারের সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে লং মার্চের ঘোষণা দেন। ৮ আগস্ট প্রাদেশিক তথ্যমন্ত্রী শফি জান বলেছিলেন, মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তারিখ ঠিক হয়েছে। প্রথমে দলের কিছু কেন্দ্রীয় নেতা পরামর্শ না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে ১০ আগস্ট আফ্রিদি বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নেতৃত্ব এবং তেহরিক তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান জোট— সবাই কর্মসূচিতে একমত।
এরপর শুরু হয় জোর প্রস্তুতি। ৩১ আগস্ট সংসদ সদস্য, দলীয় পদধারী ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজ এলাকায় তাৎক্ষণিক পথসভা, গণসংযোগ ও কর্মী সংগঠনের নির্দেশ দেন আফ্রিদি। তিনি পাঞ্জাব, সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিভিন্ন জেলা ঘুরে সমর্থন জোগান। ২৪ সেপ্টেম্বর কর্মীদের লাঠি, গুলতি বা কোনো অস্ত্র সঙ্গে না আনতে নির্দেশ দেয় দল। আফ্রিদি বলেছিলেন, একজন নেতা অনুপস্থিত হলে অন্যজন দায়িত্ব নেবেন।
আলোচনার সুযোগ দিতে ২৫ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক কমিটি কর্মসূচি এক সপ্তাহ পিছিয়ে ৪ অক্টোবর নেয়। কিন্তু ইমরান খানের চিকিৎসা, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সাক্ষাৎ এবং সন্ত্রাসবিরোধী নীতিতে কেন্দ্র ও প্রদেশের সমন্বয় নিয়ে সমঝোতা হয়নি। শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেঙে যায়।
৪ অক্টোবর লং মার্চ শুরু হয় লাক্কি মারওয়াতের গান্ডি চক থেকে। নেতৃত্বে ছিলেন সোহেল আফ্রিদি। সঙ্গে ছিলেন প্রাদেশিক সভাপতি জুনায়েদ আকবরসহ শীর্ষ নেতারা। বান্নু, ডেরা ইসমাইল খান, লাক্কি মারওয়াত ও আশপাশের জেলা থেকে কর্মীরা সেখানে জড়ো হন। পরিকল্পনা ছিল করাক, কোহাট, পেশোয়ার, চারসাদ্দা পেরিয়ে সোয়াবিতে পৌঁছানো। সেখান থেকে ইসলামাবাদের দিকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া।
কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার আগেই রেখা এঁকেছিল। ১৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেছিলেন, কোনো দলকে ইসলামাবাদে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সরকার ‘সম্ভাব্য সব উপায়ে’ মিছিল ঠেকাবে। ২০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণ নাগরিক শতবার আসতে পারেন, কিন্তু ‘সন্ত্রাসী’ হয়ে এলে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না। ২২ সেপ্টেম্বর তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছিলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাজধানীর দিকে এগোতে দেওয়া হবে না।
২৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ বলেছিলেন, প্রতিবাদ সবার অধিকার, তবে ‘ইসলামাবাদ বাদ দিয়ে’। তার বক্তব্য ছিল, রাজধানীমুখী লং মার্চের সংস্কৃতি শেষ করতে হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর ভাষা আরও কঠোর হয়। সানাউল্লাহ বললেন, জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসনসহ ‘সব বিকল্প’ টেবিলে আছে। একই দিন গভর্নর কুন্দির কটাক্ষ ছিল, ‘ওরা আগে সোয়াবি পার হোক।’
পরিহাস হলো, গতকাল পর্যন্ত মিছিল সোয়াবিই পার হতে পারেনি। শনিবার সপ্তম দিনে তা মারদানে ছিল। পরিকল্পনা বদলে সোমবার (আজ) সোয়াবি পৌঁছানোর কথা ছিল। তার আগেই জরুরি অবস্থা এসে গেল। রাজধানীর দরজায় নয়, প্রদেশের ক্ষমতার কাঠামোতেই চাপ দিল কেন্দ্রীয় সরকার।
এরপর পরিস্থিতি আরও দ্রুত বদলায়। পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সভাপতি জুনায়েদ আকবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, তাকে এবং সোহেল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে। তবে রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিদির চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তার আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারের বিষয়টি তখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। মিছিলের আগেই ইমরান খানের তিন বোন এবং শত শত পিটিআই কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। ইসলামাবাদের দিকে প্রধান সড়কগুলো কনটেইনার দিয়ে বন্ধ করেছে সরকার। মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী।
এই অবস্থায় আগের ছকে মিছিল চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বের চলাচল সীমিত। প্রাদেশিক প্রশাসনিক সহায়তা আর নেই। যোগাযোগও ব্যাহত। তার ওপর সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, গভর্নরের অধীনে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোও কাজ করবে। ফলে যে খাইবার পাখতুনখাওয়া ছিল পিটিআইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি, সেখানেই এখন মিছিলের সামনে সবচেয়ে বড় দেয়াল। তবে পিটিআই লং মার্চ প্রত্যাহার করেনি। দলটি বলেছে, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক লড়াই চলবে।
খাইবার পাখতুনখাওয়া বহুবার পাকিস্তানের ক্ষমতার সংঘাতের মঞ্চ হয়েছে। এবারও ইতিহাস যেন সেই পাহাড়ি দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। শাহবাজ সরকার হয়তো জরুরি অবস্থার চালে আপাতত ইসলামাবাদের পথ বন্ধ করেছে। কিন্তু একটি মিছিল থামানো আর তার পেছনের ক্ষোভ থামানো এক কথা নয়।
লং মার্চের সূর্য খাইবারেই ডুববে, নাকি সেখান থেকেই আরও বড় রাজনৈতিক ঝড় উঠবে, পাকিস্তানের পরবর্তী অধ্যায় এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।



