ইসরায়েলে এবার বুথে বুথে ভোটারের জোয়ার
- দুপুরেই ভাঙল পাঁচ দশকের রেকর্ড

সংগৃহীত ছবি
ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনে বুথে বুথে ভোটারদের ঢল। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টায় শুরু হয়েছে ভোটগ্রহণ। দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটদানের হার পৌঁছেছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময়ের তুলনায় এবার ভোটদানের হার বেড়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই ভোট।
ভোটার, বুথ ও আসনের হিসাব
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭৩ লাখ ৩১ হাজার ৯৮১ জন নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিক। দেশ জুড়ে ১২ হাজার ১৮টি ভোটকেন্দ্র খোলা হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী তালিকা। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠন করতে কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসন পেতে হবে।
সকাল ১০টা পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ওই সময়ের নিরিখে ১৯৮১ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ ভোটদানের হার। দুপুর ১২টায় ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
দুপুর ২টা পর্যন্ত ইসরায়েলে ভোটদানের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময়ে ভোটদানের হার ছিল ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ ও ‘ওয়াইনেট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৩ সাল থেকে ঘণ্টাভিত্তিক ভোটদানের পরিসংখ্যান সংরক্ষণের সময়কালে দুপুর ২টায় এত বেশি ভোট পড়ার নজির নেই। এর আগে এ সময়ে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার রেকর্ড হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে ভোটদানের হার। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে বললেন, কমিটির সংরক্ষিত সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের ভোটদানের হার। ১৯৭৩ সালের পর থেকে দেশ জুড়ে এমন ভোটদানের নজির নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত’— বললেন নেতানিয়াহু
গতকাল মঙ্গলবার পশ্চিম জেরুজালেমের একটি ভোটকেন্দ্রে স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী। এবার সপ্তমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি।
ভোট দেওয়ার পর নেতানিয়াহু বললেন, ‘এটি অত্যন্ত আবেগঘন ও ভাগ্যনির্ধারক মুহূর্ত। আমার স্ত্রী ও আমি অভিভূত। কী ঝুঁকির মুখে রয়েছি, তা আমরা ভালোভাবেই জানি। বিষয়গুলো স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও আমি বলব, সঠিকভাবে ভোট দিন। ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্যই আমরা তা করছি।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা, গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা, অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের সামরিক পরিষেবায় অংশগ্রহণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়— এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ বিষয়গুলো। বিরোধীরা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করলেও তার সমর্থকরা নিরাপত্তা ও সামরিক সাফল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর জোট বনাম বিরোধী শিবির
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পাশে রয়েছে শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, ওতজমা ইয়েহুদিত এবং রিলিজিয়াস জায়নবাদসহ ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো। অন্যদিকে, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, ইয়ায়ির লাপিদ, আভিগদর লিবারম্যান এবং ইয়ায়ির গোলান। তাদের দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়াশার, বেনেট ও লাপিদের বি’ইয়াহাদ, ইসরায়েল বেইতেনু এবং ডেমোক্র্যাটস। আরব-সমর্থিত রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের অবস্থানও সরকার গঠনের অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
অনিয়মের অভিযোগ, কবে ফল?
সাবেক অর্থমন্ত্রী ও ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে সম্ভাব্য অনিয়মের দিকে নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ও ইতামার বেন-গভির অবৈধ বসতিতে ভোট দিয়ে বর্তমান সরকারের নিরাপত্তানীতির পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন।
কয়েকটি রাজনৈতিক দল ব্যালট পেপার না পাওয়া, ব্যালট বিকৃত করা এবং ভোটদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। তবে পরিকল্পিতভাবে ব্যালট পেপারে ব্যাপক কারচুপির প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি। প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা।
রাত ১০টায় অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর গণনা শুরু হবে। এরপর রাতেই টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশিত হওয়ার কথা। প্রাথমিক ফল পরদিন— অর্থাৎ আজ বুধবার পাওয়া যেতে পারে। তবে বিশেষ খামের ব্যালট গণনার কারণে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত ছবি পেতে সময় লাগতে পারে। সরকারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশের শেষ সময়সীমা ৪ নভেম্বর ২০২৬।
বিপুল ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত কোন দল বা জোট সরকার গঠন করবে, তা নির্ভর করবে নেসেটের আসনসংখ্যা ও পরবর্তী জোট-আলোচনার ওপর। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের নীতিগত অবস্থান— সবকিছুর উত্তর এখন ব্যালটের ফলের অপেক্ষায়।




