মোদির সঙ্গে ৫০ মিনিটের বৈঠকে শি
বরফ গলছে দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘ টানাপড়েনের পর ভারত-চীন সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করেছে। গতকাল শনিবার ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে নয়াদিল্লির ভারত মন্ডপমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠক চলে ৫০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে। ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পরেই দুই রাষ্ট্রনেতার এই বৈঠক হয়।
শিকে বৈঠকের শুরুতে স্বাগত জানান মোদি। এ ছাড়া ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বে চীনের সহযোগিতার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদি বলেছেন, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করার এখন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কে যে দীর্ঘ ছায়া নেমে এসেছিল, তারপর এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বার্তা শি জিনপিংয়ের: বৈঠকে শি জিনপিং ভারত- চীন সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য, ভারত ও চীন বিশ্বের দুই বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, ততই দুই দেশের ওপর দায়িত্বও বাড়ছে। শি বলেছেন, ভারত ও চীনকে একে অন্যের শক্তি ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যৌথ উন্নয়নের পথে এগোতে হবে। দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু পারস্পরিক স্বার্থের জায়গা থেকে নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
মানবজাতির ভবিষ্যৎ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণ সামনে রেখে কাজ করার কথাও বলেছেন শি। ব্রিকসের ভেতরে উচ্চমানের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, বর্তমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের ইতিবাচক ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে শি: শি একটি সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করেন। পাশাপাশি এমন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা থাকবে এবং পারস্পরিক লাভের সুযোগ তৈরি হবে। শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য ভারত-চীনকে ইতিবাচক ভূমিকা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং মানুষের যাতায়াত সহজ করার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, ২০২০ সালের সংঘর্ষের পর যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক যোগাযোগ ফের জোরদার করাই এখন দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতির অন্যতম লক্ষ্য।
সীমান্তের টানাপড়েন: সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দুই দেশের সীমান্ত। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। পরে একাধিক দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর
চেষ্টা হয়। ২০২৪ সালের পর সেই প্রক্রিয়ায় কিছুটা অগ্রগতিও দেখা যায়। তারপর থেকেই রাজনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে ধীরেধীরে স্বাভাবিকতা ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
তবে সীমান্ত নিয়ে পুরনো মতপার্থক্য এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি মেটেনি। গতকালের বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে আসা দুই নেতার বক্তব্যে সীমান্ত নিয়ে কোনো নতুন চুক্তি বা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ঘোষণা করা হয়নি। বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক, যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
ব্রিকসের মঞ্চেও মোদির বড় বার্তা: মোদি-শি বৈঠকের আগে গতকাল ব্রিকসের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশ্বব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে জোরালো বক্তব্য দেন মোদি। ২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বকে তিনি ‘মানুষকেন্দ্রিক ও মানবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া’ নীতির ওপর দাঁড় করানোর কথা বলেছেন।
ব্রিকসের ২০ বছর পূর্তিকে একটি নতুন পর্বের সূচনা হিসেবে তুলে ধরে মোদি বলেছেন, এখন সংগঠনের সামনে নতুন দায়িত্ব রয়েছে। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল— জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর বিলম্বিত করা যায় না। একই সঙ্গে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোকে বিশ্বব্যবস্থায় আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মোদি। তার বক্তব্য, বর্তমানে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কয়েকটি শক্তিশালী দেশ ও প্রতিষ্ঠানের হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত। অথচ সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। তাই গ্লোবাল সাউথকে শুধু তৈরি করা নিয়ম মেনে চললেই হবে না, বিশ্বে কোনো নিয়ম তৈরি হবে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্রিকসের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন মোদি। বার্ষিক সভাপতিত্ব বদলালেও সংগঠনের কাজ যাতে থেমে না যায়, তার জন্য ‘ট্রয়কা’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সিদ্ধান্তগুলোর অনুসরণ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল নথি ভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। সেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি নথিবদ্ধ থাকবে।
নয়াদিল্লির ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে ১১টি সদস্য দেশের পাশাপাশি অংশ নিয়েছেন অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর নেতারাও। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো উপস্থিত ছিলেন। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরাও সম্মেলনে ছিলেন। আর ব্রিকসের অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ এবং নাইজেরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশিম শেত্তিমাসহ অন্য নেতারা নয়াদিল্লিতে এসেছেন।



