যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কেন ছড়িয়ে পড়ল উপসাগরজুড়ে

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এতে সংঘাত আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশেও। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
কেন নতুন করে সংঘাত তীব্র হলো?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত মাসে একটি সমঝোতা স্মারক হলেও শুরু থেকেই সেটি ছিল ভঙ্গুর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যায় বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। এই মতবিরোধই শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
সংঘাতের নতুন ধাপ শুরু হয় যখন হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য ইরানকে দায়ী করে। দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায়। তেহরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রই সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। এরপরই ইরান ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বললেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়েছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সমঝোতা স্মারকের ৫ নম্বর ধারার উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার আহ্বান জানান।
কীভাবে যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল?
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফার হামলার পর ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করেনি। তেহরান অভিযোগ করে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি, আকাশসীমা ও লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইরান বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী—
* ওমানে ডুকম বন্দরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর লজিস্টিক ও জ্বালানি সরবরাহ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
* কাতারে আল উদেইদ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। কাতার জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করেছে। তবে ধ্বংসাবশেষ পড়ে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
* কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে বিস্ফোরক ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
* বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ও রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান।
* জর্ডানে প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির কমান্ড সেন্টার ও এমকিউ–৯ ড্রোন হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সে বিষয়ে সব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কতটা বড় ছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সর্বশেষ অভিযানে প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, গোলাবারুদ গুদাম, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং নৌ-সামরিক সক্ষমতার বিভিন্ন স্থাপনা।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তিন রাতের অভিযানে ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, লোরেস্তান, খোন্দাব এবং দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশের একাধিক শহরে এসব হামলা হয়েছে। হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যে কোনো সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও সরাসরি প্রভাবিত করে।
ইরান বলছে, তাদের অনুমোদিত পথ ব্যবহার করেই জাহাজ চলাচল করতে হবে। ভবিষ্যতে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করেই প্রণালির ব্যবস্থাপনা হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। সরকারগুলো নাগরিকদের ঘরের বাইরে অপ্রয়োজনীয় চলাচল না করার নির্দেশ দেয়।
ওমান ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। কাতার নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা বাড়ার কথা জানিয়ে জনগণকে নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আকাশে প্রবেশ করা শত্রু লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করেছে। বাহরাইনেও বিমান হামলার সতর্ক সংকেত জারি করা হয়।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক শক্তির লড়াই নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় পরীক্ষা। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে পার। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
উভয় পক্ষ এখনো কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করলেও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।




