টাকা জমাতে মেনে চলুন লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপের সিইওর ৫ পরামর্শ

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাজ্যের প্রতি চারজন গ্রাহকের অন্তত একজনের অ্যাকাউন্ট আছে লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপে। এই একটি তথ্যই দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যাংকের বিশালত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
এই লয়েডসেরই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) চার্লি নান। স্বাভাবিকভাবেই লাখ লাখ মানুষের খরচ, সঞ্চয় আর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা খুব কাছ থেকে দেখেন তিনি। টাকা জমানোর কৌশল থেকে শুরু করে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচার উপায়, অর্থ ব্যবস্থাপনার এমনই কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন চার্লি নান।
সঞ্চয় হোক স্বয়ংক্রিয়
চার্লি নানের মতে, সঞ্চয় বাড়ানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো একে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলা। এর ফলে টাকা জমানোর বিষয়টি এমন একটি অভ্যাসে পরিণত হবে, যা নিয়ে আপনাকে বারবার আলাদা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না।
লয়েডসের প্রধান নির্বাহী বলেছেন, ‘আপনি যদি নিজের আয়ের একটা ছোট অংশ আলাদা করে এমন কোথাও রেখে দিতে পারেন, যেখানে আপনার সহজে হাত পড়বে না— তবে সঞ্চয়ের মানসিকতা তৈরির এটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।’
‘এটি করার জন্য চলতি অ্যাকাউন্ট থেকে সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টে একটি ডাইরেক্ট ডেবিট স্থানান্তরের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এ ছাড়া খামে করে টাকা আলাদা রাখা কিংবা কেনাকাটার পর খুচরো পয়সা জমিয়ে রাখার অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে’— টাকা জমানোর স্বয়ংক্রিয় পথ বলছিলেন চার্লি নান।
চার্লি নানের মূল কথা হলো, ‘অল্প করে জমান, তবে জমানো শুরু করুন এবং নিয়মিত জমান।’
তিনি অকপটে স্বীকার করেন, তিনি নিজে বাজেট তৈরি করা মোটেও পছন্দ করেন না। সবসময়ই তা এড়িয়েই চলেন। তাই তিনি বেতন পাওয়ার পরপরই নিজের চলতি অ্যাকাউন্ট দেখে ঠিক করে নেন কত টাকা সঞ্চয়ে পাঠাতে হবে।
চার্লির পরামর্শ হলো, ‘যত দ্রুত সম্ভব এই (পাঠানো) কাজটি করে ফেলুন।’
সম্পর্কের ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন
চার্লি নান এবং তার স্ত্রী একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। টাকা-পয়সার বিষয়ে তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা রয়েছে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার কাছে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হলো এমন সঙ্গী যে টাকা-পয়সার বিষয়ে সতর্ক নয়।
টাকা-পয়সার প্রতি তার এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে। তার ছোটবেলায় মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর তার মা একাই চার সন্তানকে বড় করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই খরচের বিষয়ে খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হতো তাকে।
পুরনো দিনের কথা মনে করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবসময় চিন্তায় থাকতাম, কোথায় কত খরচ করছি। সুপারমার্কেটে কম দামি খাবার খোঁজা থেকে শুরু করে ছুটিতে কোথায় যাব বা অবসরে কী করব— সবকিছুই খুব সাবধানে সামলাতে হতো।
সন্তানদের পকেট মানি দিন
চার্লি নান হাসতে হাসতে বলেছেন, তার সন্তানরা তার কোনো উপদেশই শোনে না, কারণ তিনি তাদের বাবা। তবে তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন যেন তারা টাকার মূল্য বুঝতে পারে।
‘তাদের নির্দিষ্ট পকেট মানি দেওয়া হয়, যা তাদের বাজেট করতে এবং সাধ্যের মধ্যে চলতে সাহায্য করে’, যোগ করেন লয়েডসের প্রধান।
চার্লি নান আরও খেয়াল করেছেন, তার দুই সন্তান খরচ করতে বেশি ভালোবাসে; অন্যদিকে বাকিরা জন্মগতভাবেই সঞ্চয়ী। ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যেও ঠিক এমনটাই দেখতে পান তিনি।
আজকের তরুণ প্রজন্ম অর্থনৈতিকভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন, এমনটা চার্লি মনে করেন না। তবে অনলাইনে এখন মানুষ যে পরিমাণ তথ্য, ভুল তথ্য ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত।
এই অনলাইন প্রতারণা থেকে বাঁচতে যেকোনো লেনদেন বা ইন্টারনেটে কেউ কিছু করতে বললে, তা নিয়ে ‘প্রশ্ন তোলার’ পরামর্শ দিয়েছেন চার্লি।
কেনার আগে একটু থামুন
চার্লি নানের এখনকার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো জালিয়াতি। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর মাধ্যমে এখন অনেক মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে।
চার্লি নান বলেছেন, প্রযুক্তির বিষয়ে বেশ দক্ষ ও চতুর হওয়া সত্ত্বেও বয়স্কদের তুলনায় তরুণরাই এই প্রতারণার ফাঁদে বেশি পা দিচ্ছে।
তার পরামর্শ হলো, অনলাইনে টাকা পাঠানোর আগে একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, অপর প্রান্তের মানুষটিকে আপনি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারেন কিনা।
ইনফ্লুয়েন্সারদের থেকে সাবধান
টাকা-পয়সা সম্পর্কে জানার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশ উপকারী। তবে ফিন্যান্সিয়াল ইনফ্লুয়েন্সারদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন চার্লি নান। তারা যেভাবে মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য কিনতে প্ররোচিত করছে, তা নিয়েই মূলত চিন্তিত তিনি।
চার্লি নানের ভাষ্য, ‘মানুষের জন্য কোনটি উপযুক্ত, তা বেছে নিতে এরা সাহায্য করে না। বরং কোনো নির্দিষ্ট ক্রিপ্টো কয়েন, মিম কয়েন বা বিনিয়োগ পণ্যের প্রচারের জন্য এরা টাকা পেয়ে থাকে।’
তার স্পষ্ট পরামর্শ, ‘যাদের পুঁজি কম, সব টাকা হারানোর ঝুঁকি আছে— এমন জায়গায় তাদের পা বাড়ানো একদমই উচিত নয়।’
এর পরিবর্তে, যারা নতুন ক্যারিয়ার বা সঞ্চয় শুরু করছেন, তাদের ঝুঁকি ও খরচের বিষয়টি নিয়ে ভাবার অনুরোধ করেছেন লয়েডস ব্যাংকের এই প্রধান।
সূত্র : বিবিসি






