যে ছবিতে ফুটে উঠেছিল নাৎসি জার্মানির আসন্ন পতন

১৯২৭ সালে আঁকা মাক্স বেকমানের ‘ভ্যারাইটি’ চিত্রকর্মে একটি বিশৃঙ্খল ক্যাবারে পরিবেশনার দৃশ্য ফুটে উঠেছে
শিল্প কি কেবলই বর্তমানের দর্পণ, নাকি তা ভবিষ্যতের এক দূরদর্শী দূরবীক্ষণ যন্ত্রও? ১৯২৭ সালে যখন জার্মানির বার্লিন বা মিউনিখের ক্যাবারে ক্লাবগুলো নাচ, গান আর আধুনিকতার আলোয় ঝলমল করছিল, যখন মানুষ ভাবছিল তারা স্বাধীনতার এক স্বর্ণযুগে বাস করছে— ঠিক তখনই ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে এক অদ্ভুত অন্ধকার এঁকেছিলেন জার্মান শিল্পী মাক্স বেকমান। তার আঁকা ‘ভ্যারাইটি শো’ পেইন্টিংটি আজ প্রায় এক শতাব্দী পর, আর্ট ক্রিটিকদের কাছে কেবল একটি ছবি নয়, বরং হিটলারের উত্থান এবং ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতনের এক অমোঘ রাজনৈতিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
পেইন্টিংটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লাল রঙের একটি সামরিক কোট পরা ব্যক্তি, যিনি মেঝেতে নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছেন। মাক্স বেকমান নিজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছিলেন এবং যুদ্ধের ট্রমা থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। তার এই ছবিতে শুয়ে থাকা সামরিক পোশাকের লোকটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া এবং পঙ্গু হয়ে যাওয়া জার্মানির প্রতীক। যিনি ‘ক্ষমতাহীন’। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, তার এই পতনের দিকে কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, স্টুলের ওপর বসা ব্যক্তিটি মুখ ফিরিয়ে আছেন, যা তৎকালীন সমাজের চরম উদাসীনতা ও ‘কেউ দায়িত্ব না নেওয়ার’ মানসিকতাকে ফুটিয়ে তোলে।
পেইন্টিংয়ের আরেকটি প্রধান চরিত্র হলো এক ব্যক্তি, যিনি টানটান নয়, বরং বেশ ঢিলেঢালা একটি দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। শিল্প ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ভাইমার প্রজাতন্ত্রের তৎকালীন ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামোর এক নিখুঁত রূপক। একদিকে ছিল তথাকথিত সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে বাড়ছিল চরমপন্থী নাৎসিদের আধিপত্য, ঘটছিল বড় বড় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। পুরো দেশটাই যেন এক ঢিলেঢালা দড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছিল, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়া নিশ্চিত ছিল।
হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি আধুনিক শিল্প, বিমূর্ততা এবং যেকোনো ধরনের পরীক্ষামূলক চিত্রকলাকে ‘অনৈতিক’ ও ‘বিক্ষিপ্ত’ বলে ঘোষণা করেন। নাৎসিরা জার্মানিকে কেবল ‘পেশীবহুল ও বীরত্বপূর্ণ’ রূপে দেখতে চেয়েছিল। বেকমানের ছবিতে যে অন্ধকার, কালো রঙের আধিপত্য এবং সমাজের কদর্য রূপ উঠে এসেছিল, তা নাৎসিদের প্রপাগান্ডার বিপরীত হওয়ায় তার ৫০০-রও বেশি ছবি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে, ‘ভ্যারাইটি শো’ আগেই দেশের বাইরে ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছে চলে যাওয়ায় নাৎসিদের আগুনের হাত থেকে বেঁচে যায়।
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি কুকুরের মতো দেখতে প্রাণী পুরো দৃশ্যটি দেখছে। অনেকে একে সমাজের ভেতরের কোনো হিংস্র শক্তির প্রতীক মনে করেন, যা পরবর্তীতে নাৎসি জার্মানির ঘাতক বাহিনীর রূপ নিয়েছিল। আর নীল কাপড়ে মুখ ঢাকা অবয়বটি যেন এক আসন্ন অজ্ঞাত ভয়ের প্রতীক।
আজ প্রায় ১০০ বছর পর বাসেলে দাঁড়িয়ে যখন দর্শকরা ‘ভ্যারাইটি শো’-এর দিকে তাকান, তখন তারা কেবল এক শতক আগের কোনো ক্যাবারে শো দেখেন না; তারা দেখতে পান কীভাবে একজন দূরদর্শী শিল্পী তার ক্যানভাসে হিটলারের বুটের শব্দ আর একটি সংস্কৃতির নির্মম মৃত্যুর পূর্বাভাস লিখে গিয়েছিলেন। বেকমানের তুলি কোনো জাদুকরের কাঠি ছিল না, তা ছিল বাস্তবতার এক নির্মম ও খাঁটি আয়না।





