ট্রাম্পের এক হুমকিতেই কুপোকাত ইউরোপ
- বিশ্ববাজারে ১০ কোটি ব্যারেল তেল-ডিজেল ছাড়ছে জি৭

কয়েক ঘণ্টা আগেও মার্কিন রপ্তানি ‘নিষেধাজ্ঞা’ হুমকির বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় আপত্তি জানিয়েছিল ইউরোপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকল না। ভয়ে নিজেদের জরুরি মজুদ বিশ্ববাজারে ছাড়ার বড় সিদ্ধান্ত নিল জি৭। সমন্বিত পদক্ষেপে বাজারে আসছে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, যার বড় অংশই থাকবে ডিজেল।
গতকাল শনিবার বিবিসির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জি৭ দেশগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মাধ্যমে আগামী চার মাসে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি বাজারে ছাড়বে। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত শুক্রবার ভিডিও বৈঠকের পর জি৭ নেতাদের যৌথ বিবৃতিতেও পরিকল্পনাটি নিশ্চিত করা হয়।
ইউরোপের ওপর মার্কিন চাপ শুরু হয় এরও আগে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জরুরি ডিজেল মজুদ কমিয়ে বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানায়। পরদিন মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার বিষয়টি এখনো তার বিবেচনায় রয়েছে। একই সময়ে তার প্রশাসন ইউরোপকে মজুদ থেকে আরও ডিজেল ছাড়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। গত বৃহস্পতিবার সেই চাপ আরও বাড়িয়ে ফ্রান্স ও জার্মানিকে জানানো হয়, তারা জরুরি মজুদ না খুললে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধের পথে যেতে পারে।
ট্রাম্পের এই অবস্থানের কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার। দেশটিতে ডিজেলের দাম রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছানোয় তার প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছিল। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনও সামনে। ডিজেল রপ্তানি কমানো হলে যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নামানো সম্ভব হতে পারে; কিন্তু তাতে ইউরোপসহ আমদানিনির্ভর বাজারে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভাব্য মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়। ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য ছিল, এমন নিষেধাজ্ঞা কারও জন্যই উপকারী হবে না এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউরোপের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত শুক্রবারের জি৭ বৈঠকে সমঝোতা আসে। সদস্য দেশগুলো জরুরি মজুদ থেকে ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি ছাড়তে সম্মত হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া, শোধনাগারের রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচি সমন্বয় এবং সম্ভব হলে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করবে না।
সংকটের কেন্দ্র এখন অপরিশোধিত তেলের চেয়ে অনেক বেশি ডিজেল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। রাশিয়া সেপ্টেম্বরের শেষদিকে ডিজেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
এর আগেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো জরুরি মজুদ বাজারে ছেড়েছিল। কিন্তু নতুন ১০ কোটি ব্যারেলের সিদ্ধান্তটি জ্বালানি বাজার শান্ত করতে আরেকটি বড় সমন্বিত পদক্ষেপ। ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তের পর তেলের দাম প্রায় ৫ ডলার পর্যন্ত নেমেছে। প্রয়োজন হলে আরও মজুদ ছাড়ার প্রস্তুতিও রয়েছে।
কিন্তু ১০ কোটি ব্যারেলের এই ঢল বাজারকে কতদিন শান্ত রাখতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জরুরি মজুদ আজকের দাম সাময়িকভাবে কমাতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ থামাতে পারে না, বন্ধ শোধনাগার চালু করতে পারে না, কিংবা বিপর্যস্ত সরবরাহ পথ রাতারাতি স্বাভাবিক করতে পারে না।
তাই জি৭-এর সিদ্ধান্ত এক অর্থে সময় কেনার চেষ্টা। আজ ভাণ্ডারের তেল বাজারে ঢেলে আগুন কিছুটা নেভানো যাবে। কিন্তু সংকট দীর্ঘ হলে সেই ভাণ্ডার আবার কত দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হবে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পরবর্তী কঠিন প্রশ্ন এখন সেটিই।



