প্রিয় ফরম্যাটেও ভরাডুবি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা সময় ওয়ানডে ছিল স্বস্তির জায়গা। ঘরের মাঠে সিরিজ এলে জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতো, প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, বাংলাদেশকে ফেভারিট ভাবার কারণ থাকত। আর দেশের বাইরে জিতলে সেটি হয়ে উঠত বড় কোনো অর্জনের গল্প।
এখন ছবিটা উল্টো। দেশের মাটিতে বাংলাদেশ এখনো সিরিজ জিতছে। কিন্তু দেশের সীমানা পেরোলেই সেই দলটিকে আর চেনা যায় না। এমনকি জিম্বাবুয়ের কাছেও সিরিজ হারতে হচ্ছে। প্রিয় ফরম্যাট ওয়ানডেই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার নাম।
পরিসংখ্যানটাও বেশ নির্মম। ২০১৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ঘরের মাঠে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের হার ছিল মাত্র একটি, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলকে সিরিজ হারিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয় কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজে একাধিক সিরিজ জয়ের সাফল্যও দেখিয়েছে। কিন্তু দেশের বাইরে সেই ধারাবাহিকতা কখনোই আসেনি।
২০২৩ সালের মে মাসের পর থেকে দেশের বাইরে কোনো দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ জিততে পারেনি বাংলাদেশ। আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টানা ছয়টি অ্যাওয়ে সিরিজে হার। ২০২৪ সালের শুরু থেকে বিদেশ ও নিরপেক্ষ ভেন্যু মিলিয়ে সর্বশেষ ২১ ওয়ানডেতে জয় মাত্র চারটি।
সাম্প্রতিক আফগানিস্তান ম্যাচটি তাই শুধু আরেকটি পরাজয় নয়, বরং পুরনো সমস্যারই নতুন করে সামনে আসা।
আর এ পরিস্থিতির মধ্যেই ম্যাচের আগের রাতের কিছু ঘটনা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দল সূত্রে আগামীর সময় জানতে পেরেছে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে যে ম্যাচে হারলেই ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাবে, তার আগের রাতে দুবাইয়ের শপিং মলে ঘুরতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের এক দল ক্রিকেটার। আরেক দল গিয়েছিল স্বর্ণ কিনতে। কেউ কেউ শহর থেকে অনেকটা দূরের রেস্টুরেন্টেও গিয়েছিলেন।
নির্বাচক হাবিবুল বাশার এটাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখছেন না, ‘চাপমুক্ত থাকতে ক্রিকেটাররা অনেক সময় নিজেদের মতো সময় কাটান। আমি একটা রিপোর্ট দেখেছি, যেহেতু দলের সঙ্গে নেই তাই কী হয়েছে বলতে পারব না। তবে এতটা হতাশ না হওয়ার অনুরোধ থাকবে, কারণ এ দলটাই দেশের মাটিতে টানা চারটি সিরিজ জিতেছে।’
তবু প্রশ্ন থেকে যায়— যে ম্যাচ হারলে টুর্নামেন্ট শেষ, সেই ম্যাচের আগের রাতে দলের প্রস্তুতি ও মনোযোগ কতটা তীব্র ছিল? কারণ মাঠের ব্যর্থতার সঙ্গে এই প্রশ্নটা এখন আলাদা করা যাচ্ছে না। অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়ও ম্যাচ শেষে সমস্যাটা আড়াল করেননি, “দেশের বাইরে খেলা ম্যাচগুলোয় বাংলাদেশ ‘টানা খুব বাজে ব্যাটিং’ করছি। আমরা বড় কোনো সিরিজ, ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপে যখন খেলতে যাই, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে সবাই ট্রফি জিততে চাই। কিন্তু আমরা শুধু মুখেই বলি, কাজে সেটার প্রতিফলন দেখা যায় না।”
এই কথাটাই হয়তো বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়না। আর্থিক সুবিধা বেড়েছে। ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু পারফরম্যান্স কি সেই অনুপাতে বেড়েছে?
সাবেক ক্রিকেটার ইমরুল কায়েসের আক্ষেপটা এখানেই, ‘আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে হয়তো খুব বড় কোনো অর্জন নেই। অনেকের মতো বড় নাম হতে বা তারকা খ্যাতি অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু অনেক বাধা, প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মাঝেমাঝে মনে হয়, বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মতো যদি আমরা আরও বেশি স্বাধীনতা, সুযোগ-সুবিধা ও নিজেদের মেলে ধরার পরিবেশ পেতাম তাহলে হয়তো আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারও অন্যরকম হতে পারত।’
অর্থাৎ সমস্যা শুধু ব্যাট-বলের নয়। প্রশ্নটা এখন মানসিকতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধ নিয়েও।




