মেয়েরা ক্রীড়াঙ্গনেও অনিরাপদ

জাহানারা আলম
কোথায় নিরাপদ নারী? ঘরে-বাইরে, অফিস-আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, বাস, ট্রেন, লঞ্চ, নৌকায়, হাটে-বাজারে, অপরাধের খবর আসে সবখান থেকেই। কোনো বয়স বাকি নেই। রাজধানীর মিরপুরে ছোট্ট রামিসার ধর্ষণের পর মর্মান্তিক হত্যায় ফুঁসে উঠেছে পুরো দেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিয়েছেন এক মাসের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি।
যুগে যুগে নারী নির্যাতন হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনেও। ক্রিকেট, ফুটবল, সাঁতার, শুটিং, ভারোত্তোলনসহ প্রায় সব খেলায়ই নারীদের নিগ্রহের খবর উঠে এসেছে বহুবার। গত বছর নভেম্বরে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের পর মুখ খোলেন অলিম্পিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শুটার কামরুন নাহার কলি, কমনওয়েলথ শুটিং ও দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী শুটার সাবরিনা সুলতানা, শারমিন আক্তাররা। তাতে বেরিয়ে আসে ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের নিরাপত্তার করুণ দশা। নিরাপত্তার চাদর নিশ্ছিদ্র তো নয়ই, ছেঁড়া রীতিমতো।
খেলোয়াড়দের অভিযোগ
শুরুটা করেছিলেন জাহানারা আলম। ২০২২ সালে নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলার সময় দলের কয়েকজন কর্মকর্তার দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন বলে গত বছর নভেম্বরে অভিযোগ করেন তিনি।
জাহানারার স্বীকারোক্তির পর নারী হেনস্তা নিয়ে মুখ খোলেন অলিম্পিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শুটার কামরুন নাহার কলি, কমনওয়েলথ শুটিং ও দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী শুটার সাবরিনা সুলতানা, শারমিন আক্তার রত্না, তাসমায়াতি এমা আলীরা। শারমিন তো মামলাই করেন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জি এম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে। তদন্তের পর সাজ্জাদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
তবে বিস্ময়করভাবে ফেডারেশন থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কৃত হন সাবরিনা, শারমিন, কলিরা! এ নিয়ে সাবরিনা সুলতানা আগামীর সময়কে বলেছেন,‘ এত অভিযোগের পর এমনিতেই ফেডারেশনের ধারেকাছে থাকা উচিত নয় সাজ্জাদ সাহেবের। আমরা গিয়েছিলাম ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি একজন নারী হয়েও অহেতুক কারণে একই ভাষায় চিঠি পাঠিয়ে নিষিদ্ধ করে দেন রত্না ও আমাকে।’
২০০৭ সালে নারী ক্রিকেটের নতুন জাগরণের প্রতিনিধি রেশমা আক্তার আদুরি অভিযোগ তুলেছিলেন নারীদের যৌন হেনস্তা নিয়ে, ‘জাতীয় দলের ৯৯ ভাগ নারী ক্রিকেটারই কুপ্রস্তাব পেয়েছেন।’
জাহানারার অভিযোগের তদন্ত শেষে মঞ্জুরুল ইসলামকে ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট সব কাজ থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। অথচ ২০২৫ সালের জুন থেকে তিনি বিসিবির কোনো চুক্তিতে না থাকায় শাস্তিটা ছিল একপ্রকার রসিকতা।
আইন মানেনি কেউ
২০০৯ সালের ১৪ মে জারি করা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০০৯’ অনুযায়ী জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অন্তর্ভুক্ত সব ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনকে কমপক্ষে তিনজন নারী সদস্যসহ পাঁচ সদস্যের একটি অভিযোগ কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছিল। হয়রানির শিকার হওয়া খেলোয়াড়রা কমিটির কাছে অভিযোগ করবেন, কমিটি অভিযোগ তদন্ত করবে। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের ৫৩টি ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের কোনোটিতেই ছিল না অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি।
মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ ফোনে একের পর এক ‘যৌন হয়রানি’র অভিযোগ পেতে থাকেন দেশের নারী ক্রীড়াবিদদের কাছ থেকে। বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নীতিমালা অনুসারে সব ক্রীড়া ফেডারেশনে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)।
যুগে যুগে যৌন হয়রানি
২০০৯ সালে জুনিয়র সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচটি সোনা জিতেছিলেন আরিফা খাতুন। কুষ্টিয়ার এই সাঁতারু ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিষপানে আত্মহত্যা করেন নিজের বাড়িতে। সতীর্থদের অভিযোগ ছিল, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে দুর্ভাগা সাঁতারু নিজেকে শেষ করে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। অভিযোগের তীর যায় আনসারের কোচ এমদাদুল হকের দিকে। তার বিরুদ্ধে আনসার তদন্ত করে এবং নানা প্রমাণের ভিত্তিতে এই সাঁতার কোচকে নিষিদ্ধ করে। বিভিন্ন অভিযোগে সাঁতার কোচ আমিরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফাকেও নিষিদ্ধ করেছিল সাঁতার ফেডারেশন।
২০১৮ সালে জাতীয় ক্লাব ভারোত্তোলনে সোনাজয়ী এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। এরপর গ্রেপ্তার হন ফেডারেশনের অফিস সহকারী ধর্ষক মো. সোহাগ মিয়া। এরপর তিনি রীতিমতো ভারোত্তোলক বনে গেছেন।
এ ছাড়া জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল নারী খেলোয়াড়দের বিদেশ ভ্রমণের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
এ ছাড়া টেনিস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্শেদের বিরুদ্ধে প্রবাসী এক কিশোরী টেনিস খেলোয়াড়কে যৌন হয়রানির অভিযোগের পর মামলাও হয়েছিল গুলশান থানায়।
সমাধানের পথ
বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন কিংবদন্তি, মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নারী আন্দোলনের অন্যতম মুখ কামরুন নাহার ডানা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমাদের মেয়েরা ক্রীড়াঙ্গনে আসতে চান, কিন্তু সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। বেশি করে নারী কোচ, ম্যানেজার রাখলে তাদের আস্থা বাড়বে। ধর্ষণের ১০-১২টি মামলার দ্রুত কঠোর শাস্তি বাস্তবায়ন হলেও ভয় পাবে অপরাধীরা।’
নারী ক্রীড়াবিদদের সুরক্ষা নিশ্চিতে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো এবং স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সাবেক জাতীয় টেবিল টেনিস খেলোয়াড় জোবেরা রহমান লিনুকে আহ্বায়ক করে বিশেষ কমিটি করার কথা রয়েছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের। এখনো চিঠি না পেলেও এই কিংবদন্তি আগামীর সময়কে বললেন, ‘কোনো কমিটির হয়ে নয়, একজন নারী ক্রীড়াবিদ হিসেবে বলছি, ধর্ষকদের সবার সামনে শাস্তি দিন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যার বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। সেটি হলেও আমি খুশি থাকব। তাহলে ক্রীড়াঙ্গনেও নারীদের হেনস্তা করতে ভয় পাবে মানসিক বিকৃতরা।’







