চিকিৎসকের ভুলে নিষিদ্ধের শঙ্কায় মাবিয়া

ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ায় শাস্তির শঙ্কায় মাবিয়া। ছবি: সংগৃহীত
হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন অনেক দিন। চিকিৎসাও নিচ্ছেন নিয়মিত। চিকিৎসক কয়েকবার হাঁটুতে জমে থাকা পানি সিরিঞ্জ দিয়ে বের করেছেন, দিয়েছেন শরীর থেকে পানি কমানোর ঔষধও। সেই ঔষধ সেবন করেই এখন বড়সড় শাস্তির শঙ্কায় দেশসেরা ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত।
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের আগে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মেডিক্যাল কমিটি ২৬জন ক্রীড়াবিদের ডোপ টেস্ট করায়। মাবিয়াও নমুনা দিয়েছিলেন। গেমস খেলে আসার পর গত জানুয়ারিতে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে জানানো হয় তার ডোপ টেস্ট পজিটিভ।
এমন খবরে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড়। ওয়ার্ল্ড এন্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা) খতিয়ে দেখছে তার বিষয়টি। এ মাসেই জানা যাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাতে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে টানা দুই এসএ গেমসে সোনাজয়ী ভারোত্তোলককে। অজ্ঞাতে নিষিদ্ধ ঔষধ সেবন করে শাস্তির শঙ্কায় থাকা মাবিয়া অবশ্য সবকিছুর জন্য বিওএ'র মেডিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব ডাক্তার শফিকুর রহমানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তবে চিকিৎসকের দাবি মাবিয়া নিজের ভুলেই পেতে যাচ্ছেন শাস্তি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেওয়া মাবিয়ার কাছে ডোপ টেস্ট খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে এন্টি-ডোপিংয়ের নিয়ম-কানুনগুলোও জানা। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনই কোন ঔষধ সেবন করেননি খেলা শুরুর পর থেকে। মাবিয়ার দাবী, হাঁটুর পুরানো সমস্যার জন্য নিয়মিতই ডাক্তারের চিকিৎসা নেন। বিওএ অথবা ফেডারেশনের নিজস্ব চিকিৎসক না থাকায় অসুস্থ হলে বাইরের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় তাকে।
চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে যে কোনো ঔষধ সেবন করলে সেটা বিওএ'র মেডিক্যাল কমিটিকে অবহিত করতে ভোলেন না মাবিয়া। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের আগে নিয়মিত ডোপ টেস্টে নমুনা দিতে গিয়ে হাঁটুর চিকিৎসার কথা শফিকুর রহমানকে জানান মাবিয়া। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রও দেখান। তবে সেই ব্যবস্থাপত্র এবং রোগের লিখিত ইতিহাস ঠিক ভাবে না দেখেই শফিকুর তাকে ডোপ টেস্ট করতে বলেন। সেই নমুনায় যে নিষিদ্ধ উপাদান ধরা পড়বে তা কল্পনাও করেননি মাবিয়া।
এখন তিনি অপেক্ষায় আছেন ওয়াডার রায়ের। এর আগেই বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে চলে আসায় বিস্মিত মাবিয়া দাবি করেন নিজের দায় এড়াতে তার ঘাড়ে দায় চাপিয়েছেন শফিকুর রহমান।
চিকিৎসককে দায় দিচ্ছেন মাবিয়া
ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার জন্য মাবিয়া দায় দিলেন বিওএ'র মেডিক্যাল কমিটির সদস্য সচিব ডাক্তার শফিকুর রহমানকে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন,‘আমার হাঁটুর চোট অনেক দিনের। ব্যথা নিয়ে ট্রেনিং করায় হাঁটুতে পানি জমে গিয়েছিলো। এর চিকিৎসা নিচ্ছিলাম এবং এটা কোথাও গোপন করিনি। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের আগে ডোপিং স্যাম্পল নিয়েছে ৩০ অক্টোবর।
নমুনা নেওয়ার সময় শফিক সাহেবকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ঔষধ খাওয়ার কথা জানাই এবং হাঁটুর ও এলার্জির ভিন্ন ভিন্ন দুটি প্রেসক্রিপশন তাকে দেখাই। আমাদের সেমিনারে বোঝানো হয়েছে যদি একটা নাপাও খাই, অবশ্যই সেটা প্রেসক্রিপশন করে খেতে হবে। অবশ্যই রোগের ব্যাকগ্রাউন্ড ডকুমেন্ট থাকতে হবে। আমার কাছে সেটা ছিল এবং নির্ভয়ে তা আমি দেখিয়েছি। শফিক ভাই আমার ব্যবস্থাপত্রের পাতাগুলো ঠিক মতো উল্টে দেখেননি। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করেই বলেছেন ডোপ টেস্ট করলে কোনো সমস্যা হবে না।’
মাবিয়ার অভিযোগ চিকিৎসক সঠিক পরামর্শ দেননি তাকে,‘ শফিক ভাইয়ের কথায় আমি স্যাম্পল দিয়েছি এবং গেমস খেলে এসেছি। ১৫ জানুয়ারি আমার কাছে একটা ফাইল আসে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে। অতি গোপনীয় ফাইল। খুলে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। তাই শফিক সাহেবকে ফোন করে জানতে চাই। তিনি আমাকে বলেন তুমি অবৈধ কিছু করেছ যার জন্য তোমার নমুনায় অবৈধ পদার্থ পাওয়া গেছে। কোন ঔষধ খাওয়া যাবে, কোনটা যাবে না এটা তার জানা থাকার কথা। এত বছর সেমিনার করেছেন, কখনই আমাদের ঔষধের নামগুলো বলেননি। উল্টো উনি আমাকে ট্রমায় মধ্যে ফেলে দেন ১০ বছর সাসপেন্ড হওয়ার কথা বলে। তিনি বলতে থাকেন আমি নাকি লুকিয়ে নিষিদ্ধ কিছু খেয়েছি। আমি যদি তাই করতাম, ডোপ টেস্টই দিতে যেতাম না ‘
শাস্তির শঙ্কা থাকলেও বিওএ থেকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন মাবিয়া,‘অলিম্পিকের মহাসচিব স্যার, ডিজি স্যারের সঙ্গেও কথা হয়। তারা বলেছেন, পুরো ব্যাপারে তাদের ভুল স্বীকার করে আইওসিতে চিঠি দেবেন। শফিক একটি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, আমার নাকি ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের পর ডোপ টেস্ট হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইভেন্টের পর আমার কোনো টেস্ট হয়নি। আমার টেস্ট হয়েছে গেমসের ১৩ দিন আগে।’
অভিযোগ মানছেন না চিকিৎসক শফিকুর
শফিকুর রহমান অবশ্য পুরো ঘটনায় দায় মাবিয়াকে দিয়েছেন। মাবিয়ার অভিযোগ মানছেন না তিনি, 'আমরা বিভিন্ন বড় গেমসের আগে অ্যাথলেটদের ডোপ টেস্ট করি। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের আগে ২৬ জনের ডোপ টেস্টের নমুনা নেই এবং পরীক্ষা করতে পাঠাই। ডিসেম্বরের শেষ দিকে জানতে পারি মাবিয়ার পজিটিভ এসেছে। এটা তাকে জানাই এবং জানতে চাই কেন বিষয়টা আমাদের জানায়নি। সাধারণত কনসালট্যান্টরা যে প্রেসক্রিপশন করেন, সেটা খতিয়ে দেখে আমরা বলে দিই কোনটা নিষিদ্ধ আর কোনটা খাওয়া যাবে। তার ভুলটা হয়েছে, সে আমাদের জানায়নি। আমাদের ফোন করে জানালেই পারতো। তাছাড়া টেস্টের সময়ও সে আমাদের প্রেসক্রিপশন দেখায়নি। যাই হোক, এখন আমরা অপেক্ষায় আছি। এ মাসেই একটা সিদ্ধান্ত পাবো। পজিটিভ হলে শাস্তি পেতেই হবে। দুই বছরও হতে পারে, আবার বড় শাস্তিও হতে পারে।'
মাবিয়ার পাশে ভারোত্তোলন ফেডারেশন
মাবিয়ার ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়া নিয়ে হতাশ ভারোত্তোলনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। মাবিয়ার পাশে দাঁড়ালেন তিনি,‘মাবিয়ার মতো একজন শীর্ষ পর্যায়ের ভারোত্তোলক কখনই অবৈধ কিছু করবে না। ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করেছে এবং ব্যবস্থাপত্র অলিম্পিকের ডাক্তারদের দেখিয়েছে। তবে এটা ঠিক ডোপ টেস্ট পজিটিভ হলে শাস্তি একটা হবেই। সেটা যাতে বড় না হয়, সেই চেষ্টা অলিম্পিকের পক্ষ থেকে করা হবে, বলে জানানো হয়েছে।’
















