আর্জেন্টিনা ফ্রান্সই শিরোপার দাবিদার

সান মারিনোকে হারানোর পর থেকেই থমাস ডুলির কদর বেড়েছে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দু-দুটি বিশ্বকাপ খেলা এই ফুটবল কোচ সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশ দলের। অভিষেক ম্যাচে ঝলক দেখানো ডুলির বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আছে নানা বিশ্লেষণ। অংশগ্রহণকারী দলগুলো নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি নিজের পছন্দ-অপছন্দ ও সেরা ফুটবলার বাছাই করেছেন। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আগামীর সময়-এর সুদীপ্ত আনন্দ
প্রশ্ন: আপনি ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছেন। ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ আবার আপনার দেশে ফিরছে। স্বাগতিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কেমন করবে?
থমাস ডুলি: যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দল এখনো পুরোপুরি শিরোপা জয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা হলো নকআউট পর্বে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কোয়ার্টার ফাইনাল হওয়া উচিত তাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে একটি শক্তিধর দেশ হলেও ফুটবলে অনেক পিছিয়ে। এর প্রধান কারণ কী?
ডুলি: যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল অন্যান্য খেলার মতো ততটা এগোতে পারেনি। আমরা হয়তো কোচিং, অবকাঠামো, প্রযুক্তিসহ অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি করেছি। তবে একটি বড় ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে— ধারাবাহিক দলীয় পরিচয় এবং গভীর মানসিক ঐক্য। ১৯৯৪ সালের দল এবং ২০০২ সালের দলের পর থেকে আমি এমন কোনো দল দেখিনি, যাদের মধ্যে একই রকম ঐক্যবদ্ধ মানসিকতা ছিল। বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা যায়, প্রযুক্তি উন্নত করা যায়, কৌশলগত অগ্রগতি আনা যায়— তবে টুর্নামেন্ট জেতে সেই দল, যারা একসঙ্গে চিন্তা করে, প্রস্তুতি নেয় এবং ত্যাগ স্বীকার করে। এই ব্যাপারটা যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে অনুপস্থিত।
প্রশ্ন: এবারের বিশ্বকাপ হবে ৪৮ দলের। আপনার কি মনে হয় দলসংখ্যা বাড়ায় টুর্নামেন্টের আকর্ষণ কিছুটা কমবে?
ডুলি: সত্যি বললে, আমি আরও বেশি দেশের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের পক্ষে। এতে ফুটবল বিশ্বব্যাপী আরও বিস্তৃত হবে এবং অনেক নতুন গল্প তৈরি হবে। তবে দলসংখ্যা বাড়ায় প্রতিযোগিতার ভারসাম্য ও টুর্নামেন্টের কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আসবে। গ্রুপ পর্বের কিছু ম্যাচের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তারপরও আমার দেশে একটি ঐতিহাসিক ও উচ্চাভিলাষী বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। আশা করছি, আজীবন মনে রাখার মতো কিছু হবে।
প্রশ্ন: দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর এটি শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। তাদের পাশাপাশি কিলিয়ান এমবাপ্পে, হ্যারি কেইন ও লামিন ইয়ামালের মতো তারকারাও থাকবেন। এই বড় নামগুলোর বাইরে আর কারা আলো কাড়তে পারেন?
ডুলি: বিশ্বকাপে সবসময়ই বড় তারকাদের বাইরে নতুন মুখের উত্থান ঘটে। জামাল মুসিয়ালা এমন একজন হতে পারতেন। তবে তিনি একটি গুরুতর চোট কাটিয়ে ধীরে ধীরে ফর্মে ফিরতে শুরু করেছেন। এর বাইরে নজর কাড়ার মতো আরও অনেক তরুণ প্রতিভা আছে, যারা টুর্নামেন্টে আলো ছড়াতে পারে। বিশ্বকাপে সবসময়ই অপ্রত্যাশিত নায়কের জন্ম হয়। তরুণদের দিকে নজর রাখতে হবে, যারা ক্লাবের ফর্মকেও বড় মঞ্চে নিয়ে আসতে পারে।
প্রশ্ন: আপনার মতে বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার কারা?
ডুলি: আমার শীর্ষ দুই পছন্দ আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকবে খেলার ধরন, দলীয় ঐক্য এবং মেসির উপস্থিতি ও নেতৃত্বের কারণে। তাদের কৌশলগত ভারসাম্য এবং জয়ের মানসিকতা রয়েছে, যা শিরোপা জয়ের জন্য যোগ্য করে তোলে। আর ফ্রান্স জুড়েই অসাধারণ সব ফুটবলারের ছড়াছড়ি, যারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে অনন্য। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাদের ভক্ত নই, তবে বলতে বাধা নেই প্রতিভা ও অভিজ্ঞতাই তাদের সবসময় অন্যতম দাবিদার করে রাখে। অন্য দলগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডকে নজরে রাখা যায়। তারা সাধারণত জেতে না, তবে বর্তমান কোচের অধীনে তাদের স্কোয়াডের ভারসাম্য ভালো।
প্রশ্ন: জার্মানির সঙ্গে আপনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জার্মানি এবার কি পারবে পঞ্চম বিশ্বকাপ জিততে?
ডুলি: না, আমি মনে করি না জার্মানি এবার বিশ্বকাপ জয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। কারণ, সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোতে তাদের সমস্যাটা বোঝা গেছে। সমস্যা প্রতিভার নয়, ঐক্য ও মনোযোগের। রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপে জার্মানির ব্যর্থতা মূলত অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে। দল নির্বাচনের সিদ্ধান্তেও খামতি ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফর্মে থাকা তরুণদের পরিবর্তে অভিজ্ঞ নামগুলোতে আস্থা রাখায় দলের গতি কমেছে।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিকে বাদ দিলে আপনার ব্যক্তিগত প্রিয় দল এবং প্রিয় খেলোয়াড় কে?
ডুলি: আমার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। আর প্রিয় খেলোয়াড় অবশ্যই লিওনেল মেসি।
প্রশ্ন: আপনার চোখে সর্বকালের সেরা কে? পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি নাকি অন্য কেউ?
ডুলি: আমার কাছে সর্বকালের সেরা মেসি। প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা, ধারাবাহিকতা, দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য এবং মাঠ পড়ে ফেলার সহজাত ক্ষমতা একেবারেই অনন্য। তিনি জায়গা তৈরি করতে ও খুঁজে নিতে পারেন, নিয়মিতভাবে অসম্ভব কাজগুলো সহজেই করে ফেলেন। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বমানের পারফরম্যান্স দেখিয়ে আসছেন। পেলে ও ম্যারাডোনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই একেকটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে মেসির দীর্ঘস্থায়ী শ্রেষ্ঠত্ব, পরিসংখ্যান এবং স্মরণীয় মুহূর্তগুলো তাকে আমার চোখে সর্বকালের সেরা করে তুলেছে।
প্রশ্ন: এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। বিশ্বকাপে খেলা এই দেশের জন্য প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন। অথচ এখানকার মানুষ ফুটবল বলতে পাগল। এখানে কাজ করার স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চয়ই বলতে পারবেন কেন বাংলাদেশ এতটা পিছিয়ে আছে?
ডুলি: বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করা খুবই কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব নয়। আমাদের একটি সঠিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার, যার সঙ্গে কিছু স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্যও থাকতে হয়। কৌশলগতভাবে ফিফা র্যাংকিংয়ে উন্নতি করা, যাতে বাছাই পর্বে ভালো ড্র পাওয়া যায়। সিনিয়র দলের ধারাবাহিক সাফল্য নিশ্চিত করা, যাতে স্পন্সর ও বিনিয়োগ আসে। ঘরোয়া লিগ ও যুব উন্নয়ন কাঠামো শক্তিশালী করা, যাতে আরও বেশি খেলোয়াড় পেশাদার মানে পৌঁছাতে পারে। একাডেমি ও ক্লাব ফুটবলের চারটি মূল স্তম্ভ— টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল, ফিজিক্যাল ও মেন্টালিটি বাস্তবায়ন করতে পারা। জাতীয় দলের পথচলা আকর্ষণীয় করে তোলা, সঠিক প্রতিপক্ষ বেছে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো ঠিকঠাক হলে সম্ভব। এসবের জন্য সময়, ধৈর্য দুটিই দরকার।




