বিষাদেও অনেক রোমাঞ্চ

গাড়ি থেকে নেমে অনুশীলন মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। গত দুই দশকে, এ দৃশ্য কতবারই না ক্যামেরাবন্দি করেছেন আলোকচিত্রীরা। ক্যামেরার লেন্সে দেখেছেন মেসির বদলে যাওয়া, বালক থেকে পুরুষ হয়ে ওঠা। তবে সোমবার সকালের ছবিতে মেসিকে কি একটু অন্যরকমই দেখাল?
সেই দিনটা অবশেষে চলেই এলো। আর্জেন্টিনার হয়ে মঙ্গলবার রাত ৮টায় শেষবারের মতো খেলতে নামবেন মেসি। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ বেনিন। সেই ম্যাচ খেলতে আর্জেন্টিনায় পৌঁছে গেছেন ফুটবলের জাদুকর। অনুশীলন জার্সিতে মেসিকে দেখা গেছে হাসিমুখেই, কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গেও করেছেন দীর্ঘ আলিঙ্গন। মেসির শেষ ম্যাচ উপলক্ষে আর্জেন্টিনা দলের জন্য বিশেষ একটি জার্সি নকশা করেছে অ্যাডিডাস। মেসির ১০ নম্বর জার্সির ‘১০’ সংখ্যাটা থাকবে লরেল পাতার বৃত্তের ভেতর আর অ্যাডিডাসের লোগোর বদলে জার্সিতে থাকবে মেসির নিজস্ব লোগো।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি চাইছেন মেসির শেষ ম্যাচটা যেন সবাই উপভোগ করে, ‘দিনটি সবার জন্যই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ ম্যাচটিতে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা সবারই আছে আর এখন কাজ শুধু মুহূর্তটি উপভোগ করা। লিওর চলে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া শূন্যতা আমরা সবাই মিলে পূরণ করার চেষ্টা করব।’ মেসির পাশাপাশি জিওভান্নি লে সেলসো, নিকোলাস ওতামেন্দি এবং রোদ্রিগো দে পলকেও এ ম্যাচের জন্য ডেকেছেন স্কালোনি। ধারণা করা হচ্ছে, তারাও আর্জেন্টিনার হয়ে নিজেদের শেষ ম্যাচটা খেলবেন মেসির সঙ্গেই।
মেসির বিদায়ী ম্যাচের প্রতিপক্ষ বেনিনের গোলরক্ষক মার্সেল দানদিনু অপেক্ষায় আছেন মেসির সঙ্গে জার্সি বিনিময় করার, তবে সেজন্য গোলবারের ‘নিরাপত্তা’ হালকা করার কথা অবশ্য বলেননি! খুব স্বাভাবিকভাবেই বেনিনের সবাই চাইছেন মেসির জার্সি, ‘আমাদের দলের যেকোনো খেলোয়াড়কে জিজ্ঞেস করলে সেও বলবে মেসির জার্সি চায়। তাই প্রচুর জার্সি তৈরি করে দলের সবাইকে একটি করে দিয়ে দিলে দারুণ হতো! কারণ আমাদের মধ্যে থেকে একজন গিয়ে জার্সি চাইলে কাজটা অত সহজ হবে না, কারণ আমরা সবাই এটা চাই। এ ম্যাচে খেলতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের এবং এ স্মৃতি আজীবন আমার মনে অমলিন থাকবে। পেশাদার ক্যারিয়ার শেষে অন্তত বলতে পারব— কিংবদন্তি মেসির শেষ ম্যাচে আমি সেই মাঠে ছিলাম। এটি সত্যিই রোমাঞ্চকর।’ নতুন নকশার জার্সিটা নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত বানিয়েছে অ্যাডিডাস!
দিনটি সবার জন্যই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ম্যাচটিতে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা সবারই আছে, এখন কাজ শুধু মুহূর্তটি উপভোগ করা
লিওনেল স্কালোনি
তবে জার্সির প্রলোভনে সত্যিটা চাপা থাকছে না। বেনিনের খেলোয়াড়দের বিমানের ইকোনমি ক্লাসে ২৩ ঘণ্টা ভ্রমণ করে আসতে হয়েছে, ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনটাই দাবি তাদের সাংবাদিকদের। হোটেলেও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি আছে। সবচেয়ে বড় আঙুলটা উঠেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দিকে। মেসির শেষ ম্যাচ সামনে রেখে যে বিপুল অঙ্কের বাণিজ্য তারা করেছে, তার সামান্যই তারা দিচ্ছে বেনিন ফুটবল ফেডারেশনকে। যেহেতু এ ম্যাচটাই যে মেসির শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে সেটা নির্ধারিত হয়েছে অনেক পরে, তাই আগে রাজি হয়ে যাওয়া বেনিনের ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা এখন বাড়তি অর্থ দাবি করছেন।
রোসারিওর ছোট্ট বালক থেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠা মেসিকে আর্জেন্টিনাবাসী আপন করে নিয়েছে একটু দেরিতে। কম বয়সেই চলে গিয়েছিলেন বার্সেলোনার লা মাসিয়াতে, আর্জেন্টিনার নিজস্ব পেশাদার ফুটবল জগতে পা রাখার সুযোগ তার হয়নি। দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ যখন একটা সময় জানল যে আর্জেন্টিনার একটা ছেলে স্পেনের একাডেমিতে ভালো করছে, তখন তার খোঁজে ভুল মানুষের কাছেই চলে যাচ্ছিল চিঠি! লিওনেল নয়, তারা খুঁজছিল লিওনার্দোকে, আর নামের মেসির বদলে তারা খুঁজছিল মেচ্চিকে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পুরনো দিনের কর্মী ওমার সাউতো এমনটাই জানিয়েছেন ‘মেসি দ্য ফরগটেন টেপ’ নামের প্রামাণ্য চিত্রে। বার্সেলোনার হয়ে খেলা, সবকিছু জেতা আর দেশের জার্সিতে খানিকটা বিবর্ণ মেসিকে আসলে দেশবাসীর হৃদয় জিততে বিশ্বকাপটা জিততে হয়েছে। সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই মনুমেন্তালে জড়ো হবেন ভক্তরা, শেষবারের মতো তাকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখতে।





