জাদুকরের টানা সাত

সংগৃহীত ছবি
তিনি চাইলে মাঠের সবুজ ঘাসে পুরো ৯০ মিনিট রাজত্ব করতে পারতেন। কিন্তু জর্ডান ম্যাচের আগের দিন লিওনেল স্কালোনি জানিয়ে দিলেন, দলের সেরা তারকা থাকছেন ডাগআউটে। তখন সবাই ভেবেছিল এটি শুধুই কোচের দেওয়া ‘বিশ্রাম’। কিন্তু জর্ডানকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর জানা গেল আসল সত্য— মেসি নিজেই শুরুর একাদশে থাকতে চাননি। নিজের রেকর্ডের পেছনে না ছুটে তিনি চেয়েছিলেন সতীর্থরা মাঠে নামুক, সুযোগ পাক নিজেদের প্রমাণ করার।
কোচ স্কালোনি বললেন, ‘সে পুরো ৯০ মিনিটই খেলতে পারত এবং প্রতিপক্ষের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, নিজের কিংবদন্তিতুল্য অবস্থানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে নিজে খেলার চেয়ে সতীর্থদের মাঠে খেলার সুযোগ করে দেওয়া এবং সামনে কী আসছে সেদিকে মনোনিবেশ করাটাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। এটি তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনেক বড় কিছু প্রমাণ করে, কারণ সবাই যেসব পরিসংখ্যান নিয়ে মেতে থাকে, সেসব সংখ্যার পেছনে সে ছোটে না। জাতীয় দল, এই দলগত ঐক্য এবং সতীর্থরা তার কাছে কতটা মূল্যবান— তা এ সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়।’
কিন্তু রেকর্ড যার পেছনে ছুটে বেড়ায়, তাকে কি আর থামিয়ে রাখা যায়? ম্যাচের শেষার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে জাদুকরী ফ্রি-কিকে জাল কাঁপালেন। গড়লেন বিশ্বরেকর্ডও। শুরু থেকে খেললে প্রতিপক্ষের ভাগ্যে কী ঘটত, তা সহজেই অনুমেয়!
বয়স ৩৯, তো কী হয়েছে, সবুজ ঘাসে পা রাখলেই ওলট-পালট হতে থাকে রেকর্ড বইয়ের পাতা। গ্যালারির গর্জনের মধ্যে তার মাঠে নামা, বলে প্রথম স্পর্শ। এরপর ৮০তম মিনিটে ২৫ মিটার দূর থেকে নেওয়া এক দর্শনীয় ফ্রি-কিকে গড়লেন নতুন ইতিহাস। চলতি আসরে এটি মেসির ষষ্ঠ গোল আর বিশ্বমঞ্চে সব মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ১৯। এই এক গোলেই ভেঙে গেছে ফ্রান্সের জুস্ত ফোঁতেন (১৯৫৮) ও ব্রাজিলের জর্জিনহোর (১৯৭০) টানা ছয় ম্যাচে গোল করার কীর্তি। কাতার বিশ্বকাপের শেষ চারটি ম্যাচ এবং চলতি আসরে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচ— সব মিলিয়ে বিশ্বমঞ্চে টানা সাত ম্যাচে গোল করার এক অবিস্মরণীয় কীর্তিগাথা রচনা করলেন লিওনেল মেসি। ফুটবল বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই অনন্য বিশ্বরেকর্ড আর কোনো ফুটবলারের নেই।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ছয়টি বিশ্বকাপে ২৯টি ম্যাচ খেলা মেসি গত ম্যাচেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন; এবার ব্যবধানটা আরও বাড়ালেন। তার বিশ্বকাপ গোল এখন ১৯টি। ডি-বক্সের বাইরে থেকে ৬ গোল করে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রিভেলিনোর (৫) রেকর্ডটিও নিজের করে নিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ১৯ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড এখন তার ঝুলিতে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখার রেকর্ডে পেলেকে (২১) অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন। ১৯ গোল এবং ৮ অ্যাসিস্টে মেসির গোল অবদান এখন ২৭টি। এক ফ্রি-কিকে এত এত কীর্তি গড়ার পর মেসিকে নিয়ে বলার মতো আর কিছু খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্কালোনি, ‘যখন লোকে মেসিকে নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন আমি একটু অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাই। কারণ আমি জানি না, তাকে নিয়ে কী বলব! এত সংখ্যা, এত রেকর্ড নিয়ে মানুষ কত কথা বলে, কিন্তু মেসি এসব নিয়ে খুব একটা ভাবেই না। তার প্রসঙ্গে একটি কথাই মাথায় আসছে— আমি বিস্মিত!’
মেসি মানেই অন্তহীন বিস্ময়। ফুটবল থেকে যা কিছু পাওয়ার, তার সবই নিজের করে নিয়েছেন এ আর্জেন্টাইন জাদুকর। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজেই বলেছিলেন, তার আর কোনো অপূর্ণতা নেই। তারপরও প্রাপ্তির খাতা ভরে উঠছে প্রতিনিয়ত। গ্রুপ পর্বের পাট চুকিয়ে এবার মিশন শেষ বত্রিশের। নকআউটে মেসিদের সামনে এই বিশ্বকাপের চমক জাগানিয়া কেপ ভার্দে। মায়ামির সেই মহারণে জাদুকর মেসি আর কী কী বিস্ময়ের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন, তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবল দুনিয়া।




