কারখানা কর্মী থেকে জার্মানির নায়ক

সংগৃহীত ছবি
জার্মানির অপেক্ষাটা ছিলো ১২ বছরের। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে শিরোপা জয়ের পর যেন বিশ্বমঞ্চ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিলো চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। যার কারণে এবারের আসরে ফেভারিটদের তালিকায় তাদের নামটাও উচ্চারিত হয়নি। এই বিষয়টিকেই হয়ত কাজে লাগিয়েছে জার্মানরা। সবার নজরের আড়ালে থেকে নিজেদের তৈরি করেছে ইউলিয়ান নাগেলসমানের দল। প্রথম ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে সাত গোলের বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর আইভরি কোস্টকে হারানো সেটাই প্রমাণ করে।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয় পেতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয়েছে জার্মানিকে। ফ্রাঙ্ক কেসির গোলে শুরুতে এগিয়ে গিয়েছিল আইভরি কোস্টই। সবাই ভেবেছিলো প্রথম ম্যাচ জয়ের পর গত দুই আসরের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে ডি ম্যানশ্যাফটরা। কিন্তু এমন সময় জার্মানির আশার দূত হয়ে আসেন স্টুটগার্টের ফরোয়ার্ড ডেনিজ উনডাফ। ম্যাচের ৬০তম মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে তিনি হারের মুখ থেকে রক্ষা করেন তার দলকে। তার জোড়া গোলেই এক যুগ পর দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করে জার্মানি।
বেশি দিন আগের কথা নয়, জার্মানি দলের ম্যানেজার ইউলিয়ান নাগেলসমানের প্রকাশ্য সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ডেনিজ উনডাভ। সেই উনডাভই এবারের আসরে জার্মানির অন্যতম প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। দুটি ম্যাচেই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখন পর্যন্ত তিনটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন, যা ১৯৯০ সালে রজার মিলার গড়া রেকর্ডের সমান।
আইভোরি কোস্টের বিপক্ষে আরও একটি ম্যাচ-নির্ধারণী অবদান রাখার পর তিনি এখন একাদশে শুরু করার দাবিদার। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাত্র ১১ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়টিতে। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে উনদাভকে শুরুতে খেলানো হবে কিনা — এমন প্রশ্নের জবাবে নাগেলসমান বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি আগেও বলেছিলাম, নানা কৌশলগত দিক নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু তার ছন্দ নষ্ট করব কেন? দুবার মাঠে নেমেছে, দুবারই গোল করেছে।’
উনদাভের গল্প অধ্যবসায় ও সংকল্পের গল্প। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে পৌঁছানোর পথ মোটেই সহজ ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভেরডার ব্রেমেন তাকে ছেড়ে দেয়। কারণ ক্লাবের মতে, তার শারীরিক গড়ন সাফল্যের পক্ষে যথেষ্ট নয়। কিন্তু স্বপ্ন ছেড়ে দেননি উনদাভ। একইসঙ্গে জীবন চালানোর জন্য তাকে কারখানাতে কাজ করতে হয়েছে, তারপরও ফুটবলের মায়া ছাড়তে পারেননি।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘ভেরডার যখন ১৪ বছর বয়সে আমাকে বলল যে আমার ভবিষ্যৎ নেই কারণ আমি বেশি ছোট — সেটা আমার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল।কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি। ১৭ বছর বয়সে পরিবারের বাড়ি ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হানোভারে যোগ দিই। সেখানে ফুটবলের পাশাপাশি একটি কারখানায় লেজার মেশিন চালিয়ে আট ঘণ্টা পূর্ণকালীন কাজও করতাম। ভোর চারটায় উঠতাম, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম, রাত আটটায় বাড়ি ফিরতাম — এবং পরদিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবলের আয়ে জীবন চলত না, তাই বাঁচার জন্যই ওই কাজটা করতে হতো।’
২০২০ সালে বেলজিয়ান ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয়াজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার উত্থানের শুরু। ক্লাবটির প্রমোশন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি এবং বেলজিয়ামের শীর্ষ লিগে ২৫ গোল করে ব্রাইটনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র পাঁচটি গোল করলেও স্টুটগার্টে ধারে যাওয়ার সুযোগ তার ক্যারিয়ারে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। ২০২৪ সালে ক্লাবটি তাকে স্থায়ীভাবে দলে নেয়। বুন্দেসলিগায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১৯ গোল করে হ্যারি কেইনের পরই স্কোরার তালিকায় দ্বিতীয় হন উনদাভ। এই পারফরম্যান্সই তার বিশ্বকাপ দলে স্থান নিশ্চিত করে।




