অদম্য আর্জেন্টিনা আর সুন্দরের স্পেন
যুবরাজের রাজত্বে উত্তরণের দিন!

ফুটবলে দ্যুতি ছড়িয়ে খ্যাতির শিখরে পৌঁছানোর রেসে বিপুল গতিতে ছুটলেও শিকড় ভোলেননি ইয়ামাল।
বার্সেলোনার উত্তরে মাতেরো শহরের রোকাফোন্ডায় স্পেনের সবচেয়ে দরিদ্র, অভিবাসীপ্রধান ও শ্রমজীবী মানুষের বসবাস। এই এলাকাটিতে দেশটির দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষ বাস করেন। একটা সময় সে দেশের চরম ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা এ অঞ্চলের মানুষদের আবর্জনার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অথচ সেখান থেকে উঠে এসে বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে এক ১৯ পেরোনো তরুণ। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিততে স্পেন তাকিয়ে রোকাফোন্ডার ঘরের ছেলে লামিন ইয়ামালের দিকে।
ফুটবলে দ্যুতি ছড়িয়ে খ্যাতির শিখরে পৌঁছানোর রেসে বিপুল গতিতে ছুটলেও শিকড় ভোলেননি ইয়ামাল। গোলের উদযাপনে দুই হাতের আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ (রোকাফোন্ডার পোস্টাল কোড ০৮৩০৪) চিহ্ন দেখিয়ে যেন বিশ্বকেই দেখিয়ে দিতে চান, প্রতিভাকে কোনোভাবেই দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একটা সময় মাটি ফুঁড়ে হলেও তা বের হয়ে আসবে। যেমনটা এসেছেন তিনি।
বার্সেলোনার লা মাসিয়া থেকে উঠে এসে লিওনেল মেসি সর্বকালের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন। ইয়ামালও সেই একাডেমি থেকে নিয়েছেন ফুটবল পাঠ। আজ ইয়ামাল বিশ্বসেরার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবেন মেসির। লা মাসিয়ার দুই প্রজন্মের এ দ্বৈরথ নিয়ে আগ্রহ তাই আকাশ ছুঁয়েছে।
লা মাসিয়া নিয়ে পেপ গার্দিওলার মন্তব্যটা অকাট্য— ‘যে খেলোয়াড় লা মাসিয়ার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে, তার মধ্যে অন্যদের চেয়ে ভিন্ন কিছু থাকে। এটি এমন এক বাড়তি গুণ, যা শুধু শৈশব থেকে বার্সেলোনার জার্সি গায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।’
বছরের পর বছর বার্সার জার্সিতে খেলে এবং সম্ভাব্য সবকিছু জিতে প্রিয় কোচ গার্দিওলার বলা কথার প্রমাণ দিয়েছেন মেসি। ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে লা মাসিয়ায় নাম লেখানো আর্জেন্টিনা তারকা ২১ বছর পর প্রিয় ক্লাব ছেড়ে যান। বার্সা ছাড়ার পরই আর্জেন্টিনার জার্সিতে সবচেয়ে বড় সাফল্য বিশ্বকাপ নিজের করে নিয়েছিলেন মেসি। সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে অমরকাব্য লেখার অপেক্ষায় বাঁ পায়ের জাদুকর। তবে মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’ থামিয়ে দিতে ‘লা রোহা’রা দেখতে চাইবে তারুণ্যের বিস্ফোরণ। লা মাসিয়ার নতুন প্রজন্মের পতাকাবাহী ইয়ামাল জ্বললেই হবে ইতিহাস।
মরোক্কান বাবা ও গিনিয়ান মায়ের ঘরে জন্মানো ইয়ামাল মাত্র সাত বছর বয়সে ঠাঁই পেয়েছিলেন লা মাসিয়ায়। বার্সেলোনার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটেছিল তার।
ইয়ামালের সঙ্গে মেসির ছবি নিয়ে হচ্ছে অনেক আলোচনা। ২০০৭ সালে ইয়ামালের বাবা-মা বার্সেলোনায় একটি দাতব্য ফটোশুটে অংশ নেওয়ার সুযোগ জিতেছিলেন। তখন ২০ বছর বয়সী মেসি পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালকে গোসল করিয়ে দিয়েছিলেন। ইয়ামাল এখন কুড়িতে পা রাখা টগবগে তরুণ। আর ৪০ ছুঁয়েও অদম্য মেসি। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্টে গোল্ডেন বল ও বুটের শক্ত দাবিদার।
লা মাসিয়ার দুই প্রজন্মের এই সাক্ষাৎটা মেসির জন্যও বিশেষ কিছু। সেই বিখ্যাত ছবির কথা মনে করিয়ে দিতেই হেসে বলেছেন— ‘ওই ছবিটা অবিশ্বাস্য! আমরা দুজনই এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছি, এটা সত্যিই এক পাগলামি।’
মেসির ছেড়ে যাওয়া বার্সার ১০ নম্বর জার্সিটা এখন ইয়ামালের। স্পেনকে ইউরো ২০২৪ জেতাতে বড় ভূমিকা রাখা ইয়ামাল বিশ্বকাপ জিততে পারলে স্পেনের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্ব ও ইউরোপসেরা হওয়ার কীর্তি গড়বেন।
ইয়ামালের প্রশংসা করে মেসি আরও বলেছেন, ‘সে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমি তার সাফল্য কামনা করি, কারণ তার সাফল্য মানে বার্সেলোনার সাফল্য।’ তবে রবিবার রাতটি তিনি ইয়ামালের হতে দিতে চান না, ‘ওর বয়স মাত্র ১৯। দারুণ ভবিষ্যৎ পড়ে আছে ওর জন্য। সে যেন এবার চ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, সেজন্য আমরা আমাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব।’
মাত্র এক গোল করলেও এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ৩০টি সফল ড্রিবল করে আলোচনায় আছেন ইয়ামাল। মেসির সফল ড্রিবল ২২টি। বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ ড্রিবলের রেকর্ডটি ডিয়েগো ম্যারাডোনার (১৯৮৬ বিশ্বকাপে ৫৩টি)। আর এই শতাব্দীর বিশ্বকাপের এক আসরে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল করেছেন মেসি (২০১৪ বিশ্বকাপে ৪৬টি)।
কোনো ক্ষেত্রে, কোনো অবস্থাতেই মেসি আর ইয়ামালের তুলনায় যেতে চান না স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। বরং ইয়ামাল যাতে তার নিজের গুণেই সেরা হয়ে ওঠেন, সে পরামর্শ দিয়েছেন অভিজ্ঞ কোচ— ‘লামিনকে লামিনের মতোই হতে হবে। মেসি একজন অনন্য খেলোয়াড় এবং তিনি একটি দুর্দান্ত বিশ্বকাপ কাটাচ্ছেন। লামিনের মধ্যেও অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে।’
ফাইনাল অনেক হিসাব মেলানোর মঞ্চ। অমরত্বের খুব কাছে পৌঁছে যাওয়া মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’ থামিয়ে মঞ্চটা নিজের করে নিতে চাইবেন ইয়ামাল।




