‘পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলায়’ মেসির জাদু!
- জন ডাল থমাসন আর্জেন্টিনার কৌশলের নাম দিয়েছেন ‘অর্গানাইজড কেওস’ অর্থাৎ পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা
- বিশ্বকাপে মেসির অ্যাসিস্ট ম্যারাডোনার সমান ৮টি। আর একটি অ্যাসিস্টে ছাড়িয়ে যাবেন তাকে

লিওনেল মেসি
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় এই দৃশ্যটা হরহামেশাই দেখা যায়। কোনো একজন পথচারীকে হঠাৎ করেই ঘিরে ধরেছে কয়েকজন, চলছে উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা। এই জটলার সুযোগেই হয়তো অলক্ষ্যে হাতসাফাইয়ের খেলা দেখিয়ে পকেট খালি করে দিয়েছে তাদের দলেরই একজন। এবার ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার বদলে কল্পনা করুন ফুটবল মাঠ আর পকেটটা বল। ২০২৬ বিশ্বকাপে একই কৌশল অবলম্বন করেছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি, ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের সদস্য ও ডেনমার্কের সাবেক ফুটবলার জন ডাল থমাসন যার নাম দিয়েছেন ‘অর্গানাইজড কেওস’ অর্থাৎ পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা।
২০২৬-এর বিশ্বকাপে কোন দল কী কৌশল অবলম্বন করছে, ফুটবল কৌশলে নতুন কী মাত্রা যোগ হচ্ছে আর কী উদ্ভাবন দেখা যাচ্ছে; এসব নিয়েই গবেষণা করবে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ। এই কাজের নেতৃত্বে আছেন আর্সেনালের সাবেক কোচ ও ফিফার বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার, তার সঙ্গে কাজ করছেন ইয়ুর্গেন ক্লিনসম্যান, গিলবার্তো সিলভা, জন ডাল থমাসন, পাওলো জাবালেতাসহ বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি সাবেক ফুটবলার। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্কালোনির কৌশল বিশ্লেষণ করে থমাসন দেখিয়েছেন, কী করে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড ও মিডফিল্ডাররা প্রতিপক্ষের রক্ষণের খেলোয়াড়দের মাঠের একটা পাশে টেনে নিয়ে বিভ্রান্ত করে মাঝমাঠে মেসির জন্য জায়গা তৈরি করে দেন, এটারই তিনি নাম দিয়েছেন ‘অর্গানাইজড কেওস’, ‘খেলার মাঠে তারা শুরুতে এক বা দুই টাচের মাধ্যমে খেলা নিয়ন্ত্রণে রাখেন আর হঠাৎ করেই মিডফিল্ডারদের পজিশন বদলের ওপর ভর করে বল সামনে বাড়িয়ে খেলার গতি বাড়িয়ে দেন। মাঝেমধ্যে এই মিডফিল্ডাররা বেশ নিচে নেমে আসেন, আবার কখনো উইং বা সাইড লাইনের ফাঁকা জায়গায় চলে যান, যার মূল উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সেন্ট্রাল স্পেস বা মাঝমাঠের মূল জায়গা থেকে টেনে বের করে আনা। আর যখনই একজন মিডফিল্ডার জায়গা পরিবর্তন করেন, সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি হয় সতীর্থদের বিপরীতমুখী মুভমেন্ট; যা মাঠের ঠিক কোন পজিশনে থাকা উচিত, তা নিয়ে প্রতিপক্ষকে এক চরম দ্বিধায় ফেলে দেয়’— জানিয়েছেন থমাসন।
এই বিভ্রান্তির সুযোগটাই মেসিকে অনেকটা ফাঁকা করে দেয়, বিশ্লেষণে জানিয়েছেন এই ডেনিশ কিংবদন্তি, ‘আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডাররা যখন মাঠের দুই প্রান্তে (ওয়াইড এরিয়া) ছড়িয়ে পড়েন, তখন প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডারদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় মস্ত বড় এক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চ্যালেঞ্জ। তারা কি মাঝমাঠের জায়গা সুরক্ষিত রাখতে ভেতরেই রয়ে যাবেন, নাকি উইংয়ে চলে যাওয়া খেলোয়াড়টিকে তাড়া করবেন? সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে, যখন তারা ভালো করেই জানেন যে একটু জায়গা ফাঁকা পেলেই সেখানে হানা দেবেন লিওনেল মেসি। আর এই দ্বিধাদ্বন্দ্বই প্রতিপক্ষের রক্ষণে তৈরি করে চরম বিশৃঙ্খলা। তবে আর্জেন্টিনার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এটি আসলে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা।’ স্কালোনি এই ঝুঁকিটা নিয়েছেন দলে মেসি আছেন বলেই! তবে থমাসন একই সঙ্গে মনে করেন, দলের অন্যরাও এই কৌশলের সঙ্গে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছেন, ‘মেসিই এই আর্জেন্টিনা দলের প্রাণভোমরা, তবে বিল্ডআপের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব একটা ঘরানা ও চমৎকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। মাত্র এক বা দুই টাচেই তারা দারুণভাবে বলের পজিশন ধরে রাখেন এবং বলের দখল হারানোর কোনো ঝুঁকিই নেন না। এরপর হঠাৎ করেই তারা খেলার গতি বাড়িয়ে দেন। মাঠে লম্বালম্বি বল বাড়িয়ে মাঝমাঠ দিয়ে দারুণ কম্বিনেশনে আক্রমণ গড়ে তোলেন তারা। প্রায়ই আক্রমণের দিক বদলে তারা বল পাঠিয়ে দেন মাঠের অন্য প্রান্তে। আর এর মাধ্যমেই ফাঁকা জায়গায় সতীর্থদের বল বাড়িয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের মহাবিপদে ফেলে দেয় আর্জেন্টিনা।’ দলের খেলোয়াড়দের ভেতর বোঝাপড়াটাও দারুণ, যে কারণে কৌশলটা কাজ করছে বলে মনে করেন থমাসন, ‘তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এক বা দুই টাচে নিজেদের মধ্যে বল দেওয়া-নেওয়া করছেন। আর এই এক বা দুই টাচের পাসিংকে তারা ব্যবহার করছেন এক ধরনের ইশারা হিসেবে, কোনো শব্দ না করেই যেন একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছেন খেলোয়াড়রা। মাঠের এই রসায়ন যেমন চোখ জুড়ানো, প্রতিপক্ষের জন্য তা সামলানোও ঠিক ততটাই কঠিন।’ খেলোয়াড়দের ভেতর নীরব এই ভাষার প্রমাণ যেন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলটা, যেখানে থিয়াগো আলমাদা না দেখেই মেসির জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন ফাকুন্দো মেদিনার বাড়ানো পাসটা।
জাদু বা হাতসাফাই, সবই আসলে নিখুঁত হিসাব আর সময়ের খেলা। দর্শকের মনোযোগ একদিকে সরিয়ে অন্যদিকে আসল কাজটা সারেন জাদুকর। স্কালোনিকে নিয়ে ফুটবলের মাঠকে এভাবেই মঞ্চ বানিয়েছেন মেসি, যেখানে চলছে তার ফুটবল জাদু।




