বিশ্বকাপের যত অঘটন

সংগৃহীত ছবি
দরজায় কড়া নাড়ছে ফুটবল
বিশ্বকাপ। এরই মধ্যে বিশ্বকাপের তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল বিশ্বে। প্রতি আসরেই
প্রত্যাশা থাকে হাতে গোনা কিছু বড় দলকে ঘিরে। তুলনামূলক ছোট দলগুলো যেন পাত্তাই পায়
না তাদের কাছে। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ হয়েছে যেখানে ছোট দলগুলো অপ্রত্যাশিত
ভাবে শক্তিশালী দলগুলোকে পরাজিত করেছে। ফুটবল বিশ্বে যা জন্ম দিয়েছে তুমুল আলোচনার। আজ এমনি কিছু ম্যাচ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
যুক্তরাষ্ট্র ১-০
ইংল্যান্ড (১৯৫০)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইংল্যান্ডকে ১৯৫০ বিশ্বকাপের অন্যতম শক্তিশালী দল ধরা হতো। দলটিতে ছিলেন আলফ র্যামজি, টম ফিনে ও বিলি রাইটের মতো তারকারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দলটি ছিল একেবারেই অখ্যাত খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া। যাদের মধ্যে ছিলেন একজন বাসন ধোয়ার কর্মী, ডাকবাহক ও স্কুলশিক্ষকও।
মাত্র একদিন একসঙ্গে অনুশীলন করেই যুক্তরাষ্ট্র দল জাহাজে চড়ে ব্রাজিলের পথে রওনা দিয়েছিল। ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে জো গ্যাটজেন্সের হেডে এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ড একের পর এক আক্রমণ চালালেও মার্কিন গোলরক্ষক ফ্রাঙ্ক বোরঘি অসাধারণ দৃঢ়তায় সব প্রতিহত করেন। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়ে মাঠ ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্র।
পশ্চিম জার্মানি ৩-২
হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
বর্তমান সময়ে বিশ্বকাপে জার্মানির ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ১৯৫৪ সালে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখনকার ‘মাইটি মাগিয়ার্স’ খ্যাত হাঙ্গেরিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কিংবদন্তি ফেরেঞ্চ পুসকাস। সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে তারা ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর গ্রুপ পর্বেই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল তারা।
ফাইনালে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। শুরুতেই দুই গোল করে দারুণভাবে এগোচ্ছিল
হাঙ্গেরি। কিন্তু জার্মানরা দ্রুত সমতায় ফেরে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছিল,
তখন ৮৪তম মিনিটে হেলমুট রানের দ্বিতীয় গোল ভেঙে দেয় হাঙ্গেরির স্বপ্ন। ফুটবল ইতিহাসে
ম্যাচটি আজও পরিচিত 'মিরাকল অব বার্ন' নামে।
উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি (১৯৬৬)
১৯৬৬ বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণই ছিল বড় বিস্ময়। স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনার সময় পশ্চিমা মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি সমর্থনের কারণে ইংলিশ ফুটবল এসোসিয়েশন উত্তর কোরিয়াকে ভিসা দেবে কি না, তা নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে ইতালির মাঝমাঠের প্রাণভোমরা জিয়াকোমো বুলগারেল্লি ম্যাচের মাঝেই চোট পান। সে সময় বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম না থাকায় ১০ জন নিয়েই খেলতে হয় ইতালিকে। এর সাত মিনিট পর পাক দু-ইকের গোল শুধু ম্যাচই জেতায়নি, দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকেও বিদায় করে দেয় টুর্নামেন্ট থেকে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে আজও স্মরণীয় সেই ম্যাচ। এমনকি ম্যাচের আসল টিকিটও সংরক্ষিত আছে ফিফা ফুটবল জাদুঘরে।
আলজেরিয়া ২-১ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২)
১৯৮২ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি এসেছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ও দুইবারের বিশ্বকাপজয়ী দল হিসেবে। কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে, লোথার ম্যাথাউস, হানসি মুলারদের নিয়ে গড়া তারকাবহুল দলটিকে অন্যতম ফেবারিট ধরা হচ্ছিল। অন্যদিকে আলজেরিয়া ছিল তুলনামূলক অখ্যাত খেলোয়াড়দের দল। তবে বিশ্বকাপের আগে থেকেই তারা দারুণ ছন্দে ছিল।
জার্মানদের আত্মতুষ্টির সুযোগ নিয়ে ৫৪তম মিনিটে রাবাহ মাজের এগিয়ে দেন আলজেরিয়াকে। কিছুক্ষণ পর রুমেনিগে সমতা ফেরালেও আবারও আঘাত হানে আলজেরিয়া। লাখদার বেলৌমির গোল স্তব্ধ করে দেয় জার্মানি ও পুরো ফুটবল বিশ্বকে।
ক্যামেরুন ১-০ আর্জেন্টিনা (১৯৯০)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, টুর্নামেন্ট ফেবারিট এবং দলে ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো মহাতারকা, সব মিলিয়ে ১৯৯০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয় অনেকটাই নিশ্চিত ধরেই নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ক্যামেরুন ছিল বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া এক আফ্রিকান দল। মিলানের ঐতিহাসিক সান সিরো স্টেডিয়ামে শুরুতে আর্জেন্টিনা আধিপত্য দেখালেও সময়ের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ক্যামেরুন। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের হেডে এগিয়ে যায় আফ্রিকানরা। শেষ পর্যন্ত সেই এক গোলই যথেষ্ট ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অঘটন উপহার দিতে।
ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বনাম বিশ্বকাপে অভিষিক্ত দল। সব নাটকীয় উপাদানই ছিল ২০০২ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে। কিন্তু ফরাসিরা বুঝতেই পারেনি কতটা পরিকল্পিতভাবে তাদের আক্রমণভাগকে থামানোর প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছিল সেনেগাল।
এল হাজি দিওফের গতি আর পাপা বুবা দিয়োপের ৩০তম মিনিটের গোলে চমকে যায় ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় তৎকালীন চ্যাম্পিয়নরা। আর সেনেগাল হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দ্বিতীয় আফ্রিকান দল।
দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ জার্মানি (২০১৮)
বিশ্বকাপে শিরোপাধারীদের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নতুন কিছু নয়। ২০১৮ সালে সেই ভাগ্য বরণ করতে হয় জার্মানিকেও। শেষ ম্যাচে জিতলেই পরের রাউন্ড নিশ্চিত ছিল জার্মানদের। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া খেলছিল শুধুই সম্মানের জন্য। ম্যাচ যখন গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ইনজুরি টাইমে কর্নার থেকে গোল করেন কিম ইয়ং-গওন।
গোল শোধে মরিয়া হয়ে জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ারও উঠে আসেন কোরিয়ার অর্ধে। সেই সুযোগে বল কেড়ে নিয়ে ফাঁকা পোস্টে দ্বিতীয় গোল করে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৩৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেয় জার্মানি। একই সঙ্গে এটি ছিল বিশ্বকাপে কোনো এশিয়ান দলের কাছে তাদের প্রথম হার।
সৌদি আরব ২-১ আর্জেন্টিনা (২০২২)
৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে এসেছিল আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসিদের অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী ধরা হচ্ছিল। ১০ মিনিটেই পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন মেসি। আরও কয়েকটি গোল অফসাইডে বাতিল হওয়ায় মনে হচ্ছিল ব্যবধান বাড়ানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৪৮তম মিনিটে সালেহ আল-শেহরির গোলে সমতায় ফেরে সৌদি আরব। পাঁচ মিনিট পর সালেম আল-দাওসারির দুর্দান্ত কার্লিং শট আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত সৌদিরা রুখে দেয় আর্জেন্টিনার সব আক্রমণ। যদিও পরে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা, তবু সেই ম্যাচ সৌদি সমর্থকদের কাছে রূপ নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় রাতগুলোর একটিতে।






