বিশ্বকাপ
দে লা ফুয়েন্তের ‘জাদুর কাঠি’ ইয়ামাল

ঘটনাটি এপ্রিলের ২৩ তারিখ সেলটা ভিগো বনাম বার্সেলোনা ম্যাচের। ৩৯তম মিনিটে লামিন ইয়ামাল পেনাল্টিতে গোল করার পর উদযাপন না করে মাটিতে শুয়ে পড়েন–– আনন্দে নয় বেশ যন্ত্রণা নিয়ে। পরে হ্যামস্টিংয়ে চোট ধরা পরে এই ১৮ বছর বয়সীর। সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র স্পেনে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়–– বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন তো ইয়ামাল?
ইয়ামালের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে যা জানা গিয়েছে তা একই সঙ্গে ভালো এবং খারাপ স্পেনের সমর্থকদের জন্য। দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইয়ামাল বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন, যা দেশটির সমর্থকদের জন্য স্বস্তিদায়ক কিন্তু তিনি কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে পারবেন না এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও অনিশ্চিত। যদি সব ঠিক থাকে তাহলে উরুগুয়ের বিপক্ষে গ্রুপ স্টেজের শেষ ম্যাচে পুরোপুরি নিশ্চিত ইয়ামাল।
র্যাংকিংয়ে যথাক্রমে ৬৯ এবং ৬১ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে ইয়ামালকে ছাড়া জিততে স্পেনকে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে হারাতে হলে বার্সেলোনার এই তারকার থাকাটা জরুরি। গ্রুপ-এইচ-এ চ্যাম্পিয়ন না হলে দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে গ্রুপ-জে-এর চ্যাম্পিয়ন। গ্রুপ-জে তে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। সেক্ষেত্রে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল চাইবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলা।
এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়ে গেছে, বার্সেলোনার আরেক তারকা ফেরমিন লোপেসকে বিশ্বকাপে পাচ্ছে না স্পেন। গ্রুপ স্টেজে ইয়ামালকে না পেলে তা হবে আরও বড় ধাক্কা। মিডফিল্ডে লোপেস এবং ডানপ্রান্তে ইয়ামালের বিধ্বংসী আক্রমণ ছাড়াই কেপ ভার্দে এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে পরিকল্পনা সাজাতে হবে লুই ফুয়েন্তকে।
স্পেন চাইবে ইয়ামাল যাতে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। কারণ ফের্মিন লোপেসের ধাক্কা পেদরি ও রুইসের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে পারলেও ইয়ামালের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযানে ইয়ামালই হচ্ছেন দলের প্রাণস্পন্দন। লা রোহা সমর্থকরা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের জন্য এই ১৮ বছর বয়সীর ওপর নির্ভর করছেন।
নির্ভর করবেন না-ই বা কেন? এই বয়সে যখন অনেকের বড় দলে জায়গা পাওয়াটাই স্বপ্নের মতো, সেখানে তিনি একের পর এক অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে ফুটবল বিশ্বে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। তার বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়নি এমন কাউওকে খুঁজে পাওয়াটা মুশকিল। মাঠের ডানপ্রান্ত দিয়ে ইয়ামাল বল নিয়ে ছুটলে প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরাটা স্বাভাবিক। তার বাঁ পায়ে আছে অনেক জাদু— বাঁক খাওয়ানো নিখুঁত শট, দুর্দান্ত ড্রিবলিং, গোল বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। হালের এই কিশোর যেন ফুটবলের জম্পেশ ম্যাজিক বক্স। মেসির পর লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা সেরা তারকা ইয়ামাল।
বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক হওয়ার পর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি ইয়ামালকে। ৩টি লা লিগা শিরোপাসহ ৬টি ট্রফি জিতেছেন তিনি। এই মৌসুমে লিগ শিরোপায় তার অবদান ১৬ গোল এবং ১১অ্যাসিস্ট। সব মিলিয়ে কাতালান ক্লাবের হয়ে ১৫১ ম্যাচে ৪৯ গোল এবং ৫২ অ্যাসিস্ট আছে এই উইঙ্গারের। মাত্র ১৮ বছরের কিশোরের জন্য এটা অকল্পনীয় পরিসংখ্যান!
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও ইয়ামালের সাফল্য ঈর্ষণীয়। স্পেনের হয়ে খেলা এবং গোল করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় তিনি। মাত্র ১৬ বছর ৫৩ দিন বয়সে তিনি জর্জিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামেন। ২০২৪ সালে ইউরো জয়ে তার ছিল গুরুত্বপুর্ণ অবদান। টুর্নামেন্টে ১ গোলসহ সর্বোচ্চ ৪টি অ্যাসিস্ট করেন বার্সেলোনার এই তরুণ তারকা। তিনিই প্রথম খেলোয়াড় যিনি একটি ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল তিনটিতেই গোল বা অ্যাসিস্ট করেছেন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে করা গোলটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আসন্ন বিশ্বকাপে ইয়ামালের মাঠে প্রভাব থাকবে অতুলনীয়। তিনি শুধু গোল করেন না তার চেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন। স্পেনের ডান প্রান্তের আক্রমণ ইয়ামালনির্ভর। এ ছাড়া তিনি বিপক্ষ দলের অন্য প্রান্তের খেলোয়াড়দের নিজের দিকে প্রেস করতে বাধ্য করেন, যার ফলে পেদ্রিসহ অন্য মিডফিন্ডারদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। স্পেনের বিপক্ষে কোনো দল চূড়ান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেললে তখন গোলের জন্য স্পেনকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়। ইয়ামালের ওয়ান-অন-ওয়ান দক্ষতা এই ব্লক ভাঙার একমাত্র কার্যকর অস্ত্র। এতসব গুণাবলির জন্যই স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামাল সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যেন জাদুর কাঠি দিয়ে তাকে স্পর্শ করেছেন।’
২০১০ সালে ইনিয়েস্তা হ্যামস্ট্রিং সমস্যা নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিলেন। পরে ফাইনালে গোল করে দেশকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেন। ইয়ামালের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে রয়েছে একই সুযোগ। তিনিও স্পেনের এই কিংবদন্তির মতো দলকে শিরোপা জেতাতে পারেন কি না, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে গোটা এক প্রজন্ম।






