মেসির আবেগী বার্তা
ফুটবলটা বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারব কিনা জানি না

বাবাকে হারানোর খবরটা শোনার পর প্রকাশ্যে আর কিছুই বলেননি তিনি। বাবার শেষকৃত্যের দুই দিন পর প্রথমবার নিজের অনুভূতি জানালেন লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মেসি স্মরণ করেছেন তার প্রয়াত বাবাকে।
বিশ্বকাপের সময়ই জানা গিয়েছিল, মেসির বাবা হোর্হে মেসি বেশ অসুস্থ। শেষ পর্যন্ত এই সপ্তাহের শুরুতেই চলে যান তিনি। এরপর সবকিছু ছেড়ে রোজারিওতে আছেন মেসি। শেষকৃত্য শেষে ফুটবল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিও নিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
বাবার মৃত্যুর চার দিন পর দেওয়া প্রথম পোস্টে মেসি লিখেছেন, ‘বাবা, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি নেই। কথাটা এখনো নিতে পারছি না, অথবা বলা ভালো, আমি মেনে নিতে চাইছি না। এটা কল্পনা করাও আমার জন্য খুব কঠিন যে তোমাকে আর কোনোদিন দেখতে পাব না। আমাদের আর কখনো কথা হবে না। আমি জানি, তুমি অনেক কষ্টে ছিলে এবং যা হয়েছে তা হয়তো ভালোর জন্যই হয়েছে। কিন্তু তুমি অনেক তাড়াতাড়ি চলে গেলে। আমাদের একসাথে উপভোগ করার মতো আরও কত কিছু বাকি ছিল!’
মেসি আরও বলেন, ‘তুমি আমাকে বারবার বলছিলে যেন তোমাকে এই বিশ্বকাপটায় খেলা দেখতে নিয়ে যাই। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেই তোমার অবস্থা অনেক খারাপের দিকে মোড় নেয়। এই প্রথমবার এমন হতে যাচ্ছিল যে তুমি কোনো টুর্নামেন্টে উপস্থিত থাকবে না, কিন্তু মা আমাকে বারবার বলছিল যে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং ভ্রমণের মতো শরীর ঠিক হয়ে যাবে। আমিও তোমাকে বলে যাচ্ছিলাম যে আমরা ফাইনালে পৌঁছাবই, যাতে তুমি খেলা দেখতে যেতে পারো।‘
বিশ্বকাপের প্রতি ম্যাচ শেষে মেসি তার বাবার জন্য অপেক্ষা করতেন বলেই জানিয়েছেন পোস্টের পরের অংশে, ‘প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি তোমার মেসেজের জন্য অপেক্ষা করতাম ও খুব মিস করতাম। তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে পরিস্থিতি সত্যিই কতটা গুরুতর। তারপরও টুর্নামেন্টে আমি যতটা সম্ভব দূর পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা ভেবেছি, যাতে তুমি অন্তত একটি ম্যাচ দেখার সুযোগ বা সময় পাও। আমরা ফাইনালে পৌঁছালাম, কিন্তু তুমি সেখানে থাকতে পারলে না। আমি টুর্নামেন্টটা জিততে চেয়েছিলাম, যাতে ট্রফিটা বাড়ি নিয়ে এসে তোমাকে নতুন একটা জয় দেখাতে পারি। কিন্তু আমি পারলাম না; আমার পা দুটো আর সাড়া দিচ্ছিল না। এবার আমি আমার শারীরিক সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। কোনোভাবেই নিজেকে পুরোপুরি ফিট মনে হচ্ছিল না।‘
মেসি বলেন, ‘আমি যখন বাড়ি পৌঁছালাম, তুমি ভেবেছিলে আমরা বোধহয় ফাইনালে পেনাল্টিতে হেরে গেছি। যা যা ঘটেছিল সে বিষয়ে আমরা কোনো কথাই বলতে পারিনি। তুমি ব্যাপারটা বিন্দুমাত্র উপভোগ করতে পারলে না। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু আমরা প্রতিটি ম্যাচ কতটা উপভোগ করেছি তা তুমি ধারণাও করতে পারবে না। আবারও তুমিই ঠিক প্রমাণিত হলে। আমার সেখানে থাকা এবং খেলাটাই সবচেয়ে জরুরি ছিল। আমি তোমাকে এই কথাগুলো বলছি, কারণ এটাই একমাত্র বিষয় ছিল যা নিয়ে আমাদের কথা হয়নি; তা ছাড়া বাকি সবকিছুই তো তোমার জানা। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম এবং আমার ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পেলেই একে অপরের সাথে দেখা করতাম।‘
পোস্টের শেষভাগে মেসি লিখেছেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি কী করব আমি জানি না, কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব তা-ও বুঝতে পারছি না। আমি কেবল ফুটবলটাই খেলেছি, আর এখন আমার খুব সন্দেহ হচ্ছে যে আমি এটি আর বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারব কিনা। শুরু থেকেই তুমি আমার পাশে ছিলে; একদম শেষ মুহূর্তে এসে কেন এমন হলো? তুমি কেন আর কিছুদিন একটু ধৈর্য ধরে থাকলে না, তাহলে তো আমরা একসাথে সব শেষ করতে পারতাম! আমি জানি যে তোমার সব সুখ লুকিয়ে ছিল পরিবারকে ভালো থাকতে দেখার মধ্যে—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানরা এবং সবার অজান্তে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতে আমাকে খেলতে দেখে। আমি ছোট থাকা থেকেই ব্যাপারটা সবসময় এরকমই ছিল। কাজ থেকে বাড়ি ফিরেই তুমি আমাকে সব অনুশীলনে নিয়ে যেতে। আবার তুমি কাজে ব্যস্ত থাকলে মা আমাকে অনেক অনুশীলনে পৌঁছে দিত। স্বাভাবিকভাবেই, তুমি কোনো ম্যাচই মিস করতে না। আমাকে খেলতে দেখে তুমি যেমন টেনশন করতে, তেমনই উপভোগও করতে, যদিও তুমি কখনো আমাকে খুব একটা প্রকাশ্যে প্রশংসা করতে না।‘
নিজের জীবনে বাবার গুরুত্বটা তুলে ধরেন মেসি, ‘তুমি আমার বাবা, আমার বন্ধু এবং আমার অভিভাবক—সবই ছিলে। প্রতিটি পরিস্থিতিতে যার যা ভূমিকা হওয়া উচিত, তুমি ঠিক সেটাই হতে এবং তুমি কখনো কোনো কিছুতে ভুল ছিলে না। কিছু মতবিরোধ বা তর্ক হওয়ার পরেও সবসময় তুমিই সঠিক প্রমাণিত হতে। দিনশেষে সবকিছু তোমার বলা কথামতোই ঘটত।‘
মেসি পোস্টের শেষটা করেছেন সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়েই, ‘আমি তোমাকে খুব মিস করব, তবে তুমি সবসময় আমার মাঝে উপস্থিত থাকবে, বিশেষ করে আমার সন্তানদের লালন-পালনের মধ্য দিয়ে, কারণ তুমি আমাকে যেভাবে শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেছ, আমিও তাদের সেভাবেই গড়ে তুলছি। শান্তিতে ঘুমাও বাবা, আর উপর থেকে আমাদের সেভাবেই খেয়াল রাখো যেমনটা এখানে থাকতে রাখতে। সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমাকে খুব ভালোবাসি, বাবা।‘




