এশিয়ার পরাশক্তিরা বিশ্বমঞ্চে পিছিয়ে

এত দেশ, এত মানুষ, শতকোটি ফুটবল ভক্ত, কতশত উন্মাদনা। তারপরও বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে জাদু দেখাতে পারে না এশিয়ান দলগুলো। এশিয়ার সেরা সাফল্য মাত্র একবার সেমিফাইনাল খেলা। ইতিহাস, অর্থনীতি, ফুটবল সংস্কৃতি, কোচিং, টেকটিকস, সামাজিক বাস্তবতা; এশিয়ার দেশগুলোর বিশ্বকাপে ভালো ফল না করার রহস্য কি লুকিয়ে আছে এসবের পেছনেই?
ঐতিহ্যে পিছিয়ে এশিয়া
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা ইউরোপের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি; দেশগুলোতে ফুটবল শুধু একটা ‘খেলা’ নয়। লাতিন অঞ্চলে রাস্তা, স্কুলে হয় শিশুদের ফুটবলে হাতেখড়ি। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই শিশুরা দেখে, তাদের পরিবার পাগলের মতো ভালোবাসে নিজের ক্লাবকে। ফুটবলের প্রতি বাড়তি সেই ভালোবাসা রূপ নেয় উন্মাদনায়ও। ‘ক্লাব ফুটবল কালচারে’ বেড়ে ওঠা সেই শিশুরাই এক সময় দেশের হয়ে মাঠে নেমে আনেন বড় সাফল্য।
এশিয়ার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা থাকলেও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে এখনো অন্য খেলার চেয়ে বেশ পিছিয়ে এশিয়া। ভারতে ক্রিকেট, চীনে বাস্কেটবল, জাপানে বেসবলের যে তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা, ফুটবল সেটিকে কখনোই ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
চীন, জাপান, কোরিয়ায় ফুটবলের চেয়েও অলিম্পিকের খেলা নিয়ে অ্যাথলেটদের মধ্যে আগ্রহ বেশি।
প্রতিযোগিতার মান
ইউরো, কোপা আমেরিকায় যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়, এশিয়ান কাপ তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। ইউরোপ ও লাতিন অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব বিশ্বের অন্য যেকোনো প্রান্তের চেয়ে জটিল ও কঠিনও বটে। বিশ্বকাপের আগেই ‘বিশ্বকাপ মানের’ প্রতিযোগিতায় খেলা দলগুলো তাই মূল পর্বে অন্য মহাদেশের চেয়ে বেশ এগিয়ে থাকে।
বিশ্বের সেরা ১০ লিগের কথা যদি বলতে হয়, প্রায় সবগুলোই ইউরোপ কিংবা লাতিন অঞ্চলের। এই দুই অঞ্চলের লিগ থেকে উঠে আসে অসংখ্য জাতীয় দলের ফুটবলার। দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া ফুটবলাররা তাই সাফল্য বেশি পান বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চেও।
ইউরোপিয়ান লিগে খেলছেন এশিয়ান অনেক বড় তারকাও। দক্ষিণ কোরিয়ার হিউ মিন সন যেমন টটেনহামের হয়ে ক্লাব ফুটবলে পেয়েছেন সাফল্য। তবে সেই সাফল্য ফিকে হয়ে যায় কোরিয়ার জার্সি গায়ে জড়ালেই।
কৌশলেই ধরাশায়ী এশিয়ার পরাশক্তিরা
আধুনিক ফুটবল এখন শুধু দক্ষতার খেলা নয়। মূল লড়াইটা হয় কৌশলেই। ইউরোপের হাই প্রেসিং, পজিশনাল প্লে, জোনাল মার্কিং কিংবা অটোমেটেড মুভমেন্ট; লাতিনের জোগো বনিতো, অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত জাদু— এশিয়া এসবে যোজন যোজন পিছিয়ে।
যদিও গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট কিছুটা পাল্টেছে। বিশেষ করে জাপান ও কোরিয়ার ফুটবলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। ইউরোপ ও লাতিন অঞ্চলের সঙ্গে পাল্লা দিতে তাই নিজেদের খেলার ধরণকেও বদলে ফেলছে এশিয়ার দেশগুলো।
শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতায় পিছিয়ে এশিয়া
গতি, উচ্চতা, শক্তিমত্তা, ওয়ান টু ওয়ান লড়াইয়ে পিছিয়ে এশিয়ান ফুটবলাররা। ইউরোপ, লাতিন ও আফ্রিকার খেলোয়াড়রা এই জায়গায় এগিয়ে।
শুধু কি শারীরিক; মানসিকভাবেও পিছিয়ে এশিয়া। লাতিন ও ইউরোপের দেশগুলো বছরের পর বছর চাপের মুখে সেরা ফলটা বের করে আনতে অভ্যস্ত। গ্রুপ পর্ব পার করলেও নকআউট পর্বের চাপ খুব একটা নিতে পারে না জাপান, কোরিয়া। জাপানের কথাই ধরুন। চারবার শেষ ১৬ থেকে বিদায় নিয়েছে এশিয়াসেরা দেশটি।
দুর্বল কাঠামোতে ধুঁকছে এশিয়ার ফুটবল
দুর্নীতি, পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল কাঠামো, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পুষ্টিহীনতা; এশিয়ার ফুটবলের শত্রু তো কম নয়! ভারত, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ফুটবল নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকলেও দিনশেষে ফলাফল তাই শূন্য।
নব্বইয়ের দশকে জাপান এনেছিল যুগান্তকারী এক পরিবর্তন। দেশে ‘ইউরোপিয়ান’ কাঠামো চালু করে ফুটবল ফেডারেশন। স্কুল থেকে ক্লাব, সবখানেই তাই এলো নতুনত্বের ছোঁয়া। পুরো এশিয়াতে তাই জাপান এখন সেরাদের সেরা। কোরিয়াও প্রায় কাছাকাছি মডেলে এগিয়ে গেছে অনেকটাই।




