নতুন মোড়কে কি সেই পুরোনো জিনিসই

বিসিবির সভায় তামিম ইকবালের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটির সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন শপিংয়ের যুগে এই প্রতারণাটা হরহামেশাই হচ্ছে। চকচকে নতুন মোড়কের ভেতর সেই পুরানো রদ্দি মাল। ক্রেতা ওয়েবসাইটে ছবি দেখে অর্ডার দিচ্ছে ঝকমকে নতুন জামার, পণ্য হাতে পাবার পর চমৎকার প্যাকেটের ভেতর দেখা গেল পুরোনো ফেঁসে যাওয়া কোনো পোষাক।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত কমিটি কি এরকমই কিছু একটা করল? প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিষদ ভেঙে দিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সরিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে যে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে দিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, সেটা তো বিসিবি নির্বাচনে চলে আসা প্রথারই ধারাবাহিকতা, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই শেষ কথা।
‘নেপোকিড’ শব্দটা বলিউডের কল্যাণে বাংলাদেশেও বেশ পরিচিত। মূলত ‘নেপোটিজম’ আর ‘স্টারকিড’ এই দুই শব্দের মিশেলে জন্ম এই বিশেষণের, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় কোনো চলচ্চিত্র তারকার সন্তানকে। রূপোর চামচ মুখে জন্ম নেয়া সেই তারকার সন্তানদের সিনেমায় অভিষেক হয় বড় ব্যানারের ছবিতে, প্রতিষ্ঠিত পরিচালকের নির্দেশনায়। থিয়েটার,টেলিভিশন, সিনেমায় ছোট ব্যপ্তির চরিত্র থেকে আস্তে আস্তে মুখ্য চরিত্রের দিকে যাবার যে দীর্ঘ পথ, নেপোকিডদের জন্য সেই রাস্তাটা কয়েক মিনিটের।
বিসিবি’র বর্তমান অ্যাডহক কমিটি যেন করণ জোহরের তেমনি এক ‘নেপোকিড’দের নিয়ে সিনেমার কাস্টিং, কোন রাখঢাক না করেই সংসদ অধিবেশনে হাসনাত আবদুল্লাহ যেটাকে বলেছেন ‘বাবার দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ বিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন কুমিল্লা-৪ আসনের সাংসদ হাসনাত। তার এমন মন্তব্যের কারণ বিসিবি’র ১১ সদস্য বিশিষ্ট অ্যাডহক কমিটিতে বিএনপি নেতাদের পুত্রকন্যাদের প্রাধান্য।
সালাহউদ্দিনের ছেলে সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ আছেন বিসিবি’র অ্যাডহক কমিটিতে, আছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরির ছেলে ইসরাফিল খসরু, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বর্ষীয়ান বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস। আছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এর স্ত্রী ব্যারিস্টার রাশানা ইমাম। ফাহিম সিনহার চাচা মিজানুর রহমান সিনহা ছিলেন খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সাংসদ।
বিগত আওয়ামী লিগ সরকারের সময়েও ক্রিকেট বোর্ডকে এভাবেই দলীয়করণ করতে দেখা গেছে। ২০১২ সালের বিসিবি নির্বাচনে খুলনা থেকে কাউন্সিলর হয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সোহেল, এরপর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে ১২ বছর তিনিই ছিলেন বিসিবি পরিচালক। এভাবেই শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, শায়ান এফ রহমানের বন্ধু ওবায়েদ নিজামদের মত লোকেরাই প্রথাগত ক্রিকেট সংগঠকদের বদলে বিসিবিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
নাজমুল হাসান পাপন ছিলেন বেক্সিমকোর বড়কর্তা, সেই সুবাদে ইসমাঈল হায়দার মল্লিক হয়ে ওঠেন বিসিবিতে অপ্রতিরোধ্য। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনী ক্রীড়া চক্র, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ঢাকা ডায়নামাইটসকে জেতাতে পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং, পছন্দমত টুর্নামেন্টের নিয়ম বদলানো, বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা নির্ধারণ, উইকেট নিজেদের সুবিধামতো বানিয়ে নেয়া থেকে শুরু করে লিগে ম্যাচ গড়াপেটাসহ অনেক অপকর্মই করে গেছেন ক্রিকেটের ‘ডাক্তার’। তবে সরকারি দল ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ ছিল না। আওয়ামী লিগ সরকার পতনের পর মল্লিক দুবাইতে, পাপন ইংল্যান্ডে। তারা নেই তবে তাদের দেখানো পথটা ঠিকই রয়ে গেছে।
ক্রিকেট বোর্ডকে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক অবয়ব দেয়ার কুশীলবরা নেই, তবে তাদের ক্ষত এখনো ভুগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। দিনের পর দিন একপেশে লিগ, তৃতীয় বিভাগ বন্ধ থাকা সহ পাতানো ম্যাচের বিষবাষ্পে প্রতিদ্বন্দিতাহীন হয়ে গেছে একসময়ের জমজমাট ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ।
এই ৫০ ওভারের ক্রিকেট টুর্নামেন্টই ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের লাইফ-লাইন, এই টুর্নামেন্ট খেলে খেলেই তো আন্তর্জাতিক স্তরের জন্য তৈরি হয়েছিলেন নান্নু-আকরাম-বুলবুলরা। বিপিএলে নানান প্রভাব খাটিয়ে ফল পক্ষে আনার চেষ্টা কম করেননি খালেদ মাহমুদ সুজন। এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বেক্সিমকো নেই, বিপিএলে সুজনের দলও ভুলে গেছে জিততে।
তামিমের নেতৃত্বে বিএনপির যেসব ‘নেপোকিড’রা বিসিবি পরিচালক হয়েছেন, তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই উদ্দেশ্যে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ‘নোংরামি’ দেখে তামিম সহ অনেকেই সরে দাঁড়ান, যাদের মধ্যে ইসরাফিল, ইয়াসির ও ইব্রাহিমও ছিলেন। অ্যাডহক কমিটিতে তারা পেয়েছেন পরিচালকের দায়িত্ব। তবে তাতে কি বিসিবি’র ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের গভীরে ঢুকে যাওয়া চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হবে? নাকি অনলাইনে ক্রেতার মত আবারো প্রতারিত হবে ক্রিকেটপ্রেমীরা?
খানিকটা আশার আলো এই যে বাবার পরিচিতির জোরে হলেও যারা বিসিবিতে এসেছেন, তাদের নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচ্ছন্ন একটা ভাবমূর্তি আছে। ইসরাফিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থনীতি ও রাজনীতির উপর স্নাতক করেছেন, ইয়াসির আব্বাসও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে করে এসেছেন এমবিএ। সাঈদ ইব্রাহীম ব্যবসা প্রশাসনে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক,ইংল্যান্ডে পড়ালেখা করার সময় ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের ক্রিকেট দলে খেলেছেন, ক্রিকেট নিয়ে ইংরেজিতে কলামও লিখেছেন কিছু পত্রপত্রিকায়।
অবশ্য সেসব তো নাজমুল হোসেন পাপনেরও কিছু কম ছিল না। ঔষধ ব্যবসায়ীদের বৃত্তে তার সাফল্য গল্পের মত ছড়িয়ে আছে। দেশের ঔষধ শিল্পকে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়া ও বিদেশে বাজার সম্প্রসারণে তার অবদান অনেক, বরং ক্রিকেট নিয়ে তার কথাবার্তাই কিছুটা হাস্যরসের জন্ম দিত। যখন সভাপতি হলেন, তখন তার বাবা জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি, তারপরও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কখনো বিরূপ ব্যবহার করেননি, বিরুদ্ধমতকে দমন করাতে চাননি।
অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হয়ে প্রথম উপস্থিতিতেই তামিম বলেছেন তিনি সভাপতি পদে নির্বাচন করতে চান। যেমনটা অতীতে করেছিলেন পাপন, বুলবুলও। এরকম নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয় তার বহু উদাহরণ আছে। খেলার মধ্যে রাজনীতির মিশেল ঘটালে কি হয় সেই উদাহরণ একদম টাটকা। তাই ক্রিকেটপ্রেমীরা আশা করতেই পারেন যে অ্যাডহক কমিটিতে যারা আছেন, তাদের মাথায় শুভবুদ্ধির উদয় হবে। কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়, আর এবারে তো রীতিমতো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।

