‘সরকার’ হয়ে সৌম্য সবসময় সব দলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বছর তিনেক আগের কথা। চন্ডিকা হাথুরুসিংহে দ্বিতীয় দফায় কোচ হয়ে এসেছেন। প্রিয় শিষ্য সৌম্য সরকারকে বিশ্বকাপ দলে ঢোকার সুযোগ দিতে ডেকে এনেছেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। সেখানেই সাংবাদিকদের প্রশ্নে সে সময়ে জাতীয় দলের সহকারী কোচ নিক পোথাস বলেছিলেন, ‘ব্যাটারদের জন্য একমাত্র মুদ্রা হচ্ছে রান।’ অর্থাৎ তাদের দলে জায়গা পেতে হবে রানের বিনিময়ে। তবে বাংলাদেশে ব্যাংক লুটেরাদের খপ্পরে পড়া ব্যাংকগুলোকে যেভাবে সরকার টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিয়েছে, অনেকটা একইভাবে সৌম্য সরকারকেও লম্বা সময় ধরেই ‘প্রণোদনা’ দিয়ে আসছেন নির্বাচকরা।
আবুধাবিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটা ছিল সৌম্য সরকারের ক্যারিয়ারের ৮৭তম ওয়ানডে। ক্যারিয়ার জুড়েই প্রচণ্ড অধারাবাহিক সৌম্য, একটা ভালো ইনিংসের পিঠে ভর করে লম্বা সময় ধরে খারাপ করেও টিকে থাকেন। মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২, এরপর হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৬, ৫-এর পর ৬৯ করেছিলেন, আবুধাবিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ফের ৯। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ বছর পার করা সৌম্য টপঅর্ডারে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে সুযোগ দিতে ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে সাতে খেলানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও কাজে লাগেনি। ২০২১, এরপর ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাঝে বছরখানেক ওয়ানডে দলের বাইরে ছিলেন সৌম্য, এরপর ঢুকেছেন আর টিকে আছেন।
যে সময়টায় ওয়ানডে দলে ছিলেন না, তখন আবার টি-টোয়েন্টি দলে নিয়মিত ছিলেন সৌম্য। কীভাবে যেন সুযোগ হয়ে যায় সব বিশ্বকাপেও। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলে এসেছিলেন স্রেফ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০ রানের একটা ইনিংস খেলে। ২০১৯ বিশ্বকাপে একটা ম্যাচেও ভালো শুরু এনে দিতে পারেনি সৌম্য-তামিম ইকবালের উদ্বোধনী জুটি।
২০২৩ বিশ্বকাপে তাকে দলে নেওয়ার প্রচেষ্টায় সে সময়ে ৩০ বছর বয়সী এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় এক দশক কাটিয়ে দেওয়া সৌম্যকে নেওয়া হয়েছিল উদীয়মান ক্রিকেটারদের আসর ইমার্জিং টিমস এশিয়া কাপে! সেখানে তিন ইনিংসে সুযোগ পেয়েছিলেন ব্যাটিংয়ের, কোনো হাফসেঞ্চুরিও করতে পারেননি আর দলও জিতেছে এক ম্যাচে। তাই ২০২৩ বিশ্বকাপে জায়গা হয়নি। তবে সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিতে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় তাকে ভালোভাবেই রেখেছেন নির্বাচকরা।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২টি শূন্য সৌম্যর। সবশেষ মৌসুমে রংপুরের হয়ে সাত ম্যাচে ১৫৯ রান, একটা হাফসেঞ্চুরি, স্ট্রাইকরেট ১৩৯ আর গড় ২৭। তবু সৌম্য পেয়ে যান জাতীয় দলের টিকিট। তার আগের মৌসুমে তো সৌম্যর রানের পারফরম্যান্স আরও করুণ, চার ম্যাচে ১০৫ রান! ২০২৩ সালে ১২ ম্যাচে ১৭৪ রান, একটা হাফসেঞ্চুরি, গড় ১৫ দশমিক ৫০ আর স্ট্রাইকরেট ১০৮। ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন দুর্বল পারফরম্যান্সের পরও ২০২৪ সালে তাকে ১২টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে সুযোগ দেওয়া হয়েছে জাতীয় দলে, খেলেছেন বিশ্বকাপেও। অথচ দুটি ম্যাচে ৪৩ রান করাই তার সেরা সাফল্য, শূন্য রানে আউট হয়েছেন দুবার।
সৌম্য সবশেষ টেস্ট খেলেছেন পাঁচ বছর আগে, ২০২১ সালে। অথচ টেস্ট দলে তাকে রাখার পেছনে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার যুক্তি দেখিয়েছেন, ‘যেই পেসটা আমরা অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যাশা করছি, এটি খেলে সে অভ্যস্ত।’
তবে আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের স্কোয়াডে কেন সৌম্যকে রাখা, সেই সদুত্তর নেই। অস্ট্রেলিয়া সফরে টেস্ট দলে ছিলেন তবে একাদশে জায়গা হয়নি, আবুধাবিতেও তাই। পর্যটকের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন সৌম্য, এক্ষেত্রে তার কারেন্সি ২০২৫ সালের জাতীয় লিগে করা ৬৩৩ রান, যার সিংহভাগটাই ময়মনসিংহ বিভাগের দুর্বল বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে। নাহিদ রানার রাজশাহীর বিপক্ষে তার রান ৬ এবং ১০, রাহি-নাসুমদের সিলেটের বিপক্ষে রান ২৭ ও ১৭। এই কুড়িয়ে পাওয়া রান দিয়েই জাতীয় দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সৌম্য, ১২ বছরেও যার প্রতিভার(!) ধার কমেনি।



