বাংলাদেশ সিরিজে ইতিহাসের হাতছানি হ্যাজলউডের

১৩ মাস পর টেস্টে ফিরছেন হ্যাজলউড। ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বোলার হিসেবে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলকে পা রেখেছিলেন কিংবদন্তি পেসার লিলি। ১৯৮১ সালে তার সেই কীর্তির পর ৩০০ বা বেশি উইকেট পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার আরও পাঁচ পেসার—গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, মিচেল জনসন, মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স। সেই মাইলফলকে পা রাখার অপেক্ষায় এখন জস হ্যাজেলউড। ৭৬ টেস্টে ২৯৫ উইকেট তার। বাংলাদেশের বিপক্ষে আগস্টে হতে যাওয়া ২ টেস্টের সিরিজেই গড়তে পারেন কীর্তিটা।
হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে গত গ্রীষ্মে ঘরের মাঠে অ্যাশেজে ছিলেন না হ্যাজলউড, পরে ভুগেছেন অ্যাকিলিসের সমস্যায়ও। ডারউইনে বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সামনে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রিসবেনের ন্যাশনাল ক্রিকেট সেন্টারে নিজেকে নতুন করে শানিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
একাদশে সুযোগ পেলে দীর্ঘ ১৩ মাস পর টেস্টে ফিরবেন হ্যাজলউড। ২০১৪ সালে অভিষেকের পর এটিই টেস্টে হ্যাজলউডের দীর্ঘতম বিরতি। নিজের মাইলফলকের চেয়ে সামনে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সিরিজগুলোতে দলকে জেতাতেই বেশি ভূমিকা রাখার কথা বলেছেন ৩৫ বছর বয়সী এই পেসার।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে তিনি বললেন,‘আমাদের এই গ্রুপটা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে খেলছে। সামনে বড় কয়েকটা সিরিজও আছে। যেমন ভারত আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ। আমি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও কোনো সিরিজ জিতিনি। সামনে এমন তিনটি সফর আসছে। শুধু আমার একার নয়, পুরো দলের জন্যই কিছু পুরোনো হিসাব চুকানোর সুযোগ রয়েছে।’
অস্ট্রেলিয়ার প্রশংসিত 'বিগ ফোর' বোলিং আক্রমণ (হ্যাজলউড, কামিন্স, স্টার্ক ও নাথান লায়ন) ভারত, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায় কোনোটিতেই একসঙ্গে কোনো টেস্ট সিরিজ জিততে পারেননি। এটা স্মরণ করে হ্যাজলউড বললেন, ‘এই প্রস্তুতির পুরো সময়টাতে, এমনকি তার আগের মাসগুলোতেও আমাদের মাথার মধ্যে এই বিষয়টাই কাজ করেছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ এবং সবগুলোই বিদেশের মাটিতে। প্রতিযোগিতা খুব কঠিন হবে, তবে আশা করি আমরা কাজটি সফলভাবে শেষ করতে পারব।’
গত গ্রীষ্মে অ্যাশেজে হ্যাজলউডের জায়গায় স্কট বোল্যান্ড দারুণভাবে চেনান নিজেকে। ৫ টেস্টে ২০ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি দলের তিন জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ স্পেল উপহার দেন তিনি। ফিট হ্যাজলউডকে বাদ দিয়ে বোল্যান্ডকে দলে নেওয়া হয়েছিল মাত্র একবার (২০২৩ সালের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে, যখন হ্যাজলউড অ্যাকিলিস থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেননি)। তবে জাতীয় নির্বাচক কমিটির প্রধান জর্জ বেইলি গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, একাদশে জায়গা পাওয়ার এই লড়াইটি এখন চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
বেইলি বলেছিলেন, ‘স্কটি (বোল্যান্ড) মুখে কিছু বলবে না, তবে আমার মনে হয় সে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, বিগ থ্রি শব্দটা যখন ব্যবহার করা হয়, তখন সে-ও তাদের একজন হতে পারে।’
২০২১ সালের ডিসেম্বরে অভিষেকের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার ৪৬টি টেস্টের মধ্যে ১৯টিতে খেলেছেন বোল্যান্ড, ১৮.৫৮ গড়ে নিয়েছেন ৮২টি উইকেট। একই সময়ে হ্যাজলউডের পরিসংখ্যানও প্রায় একই রকম (২০ ম্যাচে ২০.৪০ গড়ে ৮০টি উইকেট)।
বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া চার পেসার নিয়ে মাঠে নামবে কি না—এমন একটা সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদিও সম্প্রতি নাথান লায়নকে বাদ দিয়ে দল সাজানো হয়েছে কেবল দুটি গোলাপী বলের দিবা-রাত্রির টেস্টে।
ডারউইনে খেলতে হ্যাজলউড মুখিয়ে আছেন ঠিকই, তবে আগামী ১২ মাসে ২০-২১টি টেস্টের মতো এত বড় সূচিতে সাফল্য পেতে হলে দলের সব মানসম্পন্ন পেসারদেরই কাজে লাগাতে হবে বলে মনে করেন তিনি,‘আমার মনে হয় বোল্যান্ডের সঙ্গে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেছি—২০২৩ সালে এজবাস্টনে। তবে ওর সঙ্গে আরও খেলার ইচ্ছে আছে। আমাদের বোলিংয়ের ধরন দেখতে কিছুটা একই রকম মনে হলেও দুজনের বোলিংয়ের পার্থক্য অনেক।’
তিনি আরও যোগ করেন,‘আমাদের দলে মাইকেল নেসার এবং ব্রেনডান ডাগেটও আছে। আমার মনে হয় আগামী ১৮ মাসে আমাদের এই ছয়জন পেসারের ওপরই কোনো না কোনো সময় ভরসা করতে হবে। গত বছরের অ্যাশেজের কথাই ধরুন। প্যাটি (কামিন্স) একটা টেস্ট খেলেছিল, আমি একটাও খেলিনি; অথচ দরকারের সময় নেসার ও ডাগেট দায়িত্ব সামলেছে এবং আমরা সিরিজ জিতেছি।’
বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের বড় স্বপ্নের পাশাপাশি হ্যাজলউড নজর দিয়েছেন নিজের খুঁটিনাটি প্রস্তুতির দিকেও। গত কয়েক বছর ধরে চোটে ভুগে টেস্ট ক্যারিয়ার যে থমকে ছিল, ব্রিসবেনে কঠোর অনুশীলনে তা পেছনে ফেলতে চাইছেন তিনি।
এর অংশ হিসেবে টেস্ট ম্যাচের আসল আবহ তৈরি করে বোলিং করছেন তারা। পাঁচ দিনের ম্যাচের ধকল সামলাতে তিনি ও বাকি পেসাররা সকাল ও বিকালের দীর্ঘ সেশনে বল করে নিজেদের শরীরকে তৈরি করছেন বলে জানালেন হ্যাজলউড,‘কোনো ম্যাচ না খেলে সরাসরি টেস্ট ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত এবারই প্রথম। তাই আমরা আমাদের পছন্দমতো সেশনগুলো সাজিয়ে নিতে পেরেছি। মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার বড় ধরনের বোলিং সেশন করা হয়েছে, আর তার আশেপাশে অন্য কাজগুলো রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে আমরা টানা দুইদিন—মঙ্গলবার ও বুধবার বল করেছি, আগামী সপ্তাহেও হয়তো টানা বল করতে হবে।’
হ্যাজলউড আরও যোগ করেন,‘অন্যান্য টেস্ট সিরিজের আগে আমাদের টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডে খেলতে হতো, সঙ্গে থাকত ভ্রমণের চাপ। তাই এমন দীর্ঘ বোলিং সেশন বের করা কঠিন ছিল। কিন্তু এবার কেবল টেস্টের কথা মাথায় রেখেই প্রস্তুতিটা সাজানো হয়েছে, যা আমাদের কাজে দেবে।’
তিনি শেষ করেন এভাবে, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি এটা একদিন একদিন করে দেখেছি—ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ করেছি, বোলিংয়ের মাত্রা বাড়াচ্ছি। আগামী সপ্তাহে আরও একটি ধাপ পার করব, আর সব কাজ ঠিকঠাক শেষ হলে তারপর আমরা ডারউইন নিয়ে (বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট) ভাবব।’



